১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শাহজালাল বিমানবন্দরের স্ট্রং রুমে রহস্যজনক তালা ভাঙা: মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া যাওয়ার শঙ্কা

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো হাউজে অগ্নিকাণ্ডের পর এবার নতুন করে দেখা দিয়েছে আরও বড় রহস্য। আগুন নেভানোর পর যেই স্ট্রং রুমটি সিলগালা করা হয়েছিল, সেটির তালা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের শঙ্কা—এই ঘটনার পর সেখান থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র ও স্পর্শকাতর সরকারি-বাণিজ্যিক নথি খোয়া যেতে পারে।

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডে স্ট্রং রুমের ভল্ট বা তার ভেতরে থাকা কোনো সামগ্রী পুড়ে যায়নি। ওই ভল্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য আমদানি করা বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্রও রাখা ছিল। তাই তালা ভাঙার পর অস্ত্র বা নথি খোয়া যাওয়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।

তবে এখনো পর্যন্ত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কিংবা পুলিশ কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেনি—ভেতর থেকে কিছু লুট হয়েছে বা খোয়া গেছে কি না। ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও বিমানবন্দর থানার একটি বিশেষ দল।


ঘটনাপ্রবাহ

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে গত ২৮ অক্টোবর বিমানবন্দর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। সেখানে বলা হয়, ২৪ অক্টোবর বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার নেয়ামূল, বিমানের জেনারেল ম্যানেজার (কার্গো) নজমুল হুদা এবং এনএসআইর অতিরিক্ত পরিচালক ফিরোজ রব্বানীর উপস্থিতিতে স্ট্রং রুমের ইনভেন্টরি সম্পন্ন করা হয়।

সব মালামাল গুনে-তুলে ভল্টে রাখার পর, সবার উপস্থিতিতে তালা ঝুলিয়ে শেকল দিয়ে সিলগালা করা হয়। সর্বশেষ ২৭ অক্টোবর রাত ৯টা ৫০ মিনিটে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা গিয়ে তালা অক্ষত আছে কি না তা যাচাই করেন।

পরের দিন, ২৮ অক্টোবর সকাল ৭টা ৭ মিনিটে বিমান নিরাপত্তা শাখার ডিউটি অফিসার জাহাঙ্গীর আলম খান ফোনে খবর পান যে স্ট্রং রুমের ভল্টের তালা লাগানো নেই। খবরটি দ্রুত জানানো হয় ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (সিকিউরিটি)কে। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সিলগালা করা তালা ভাঙা এবং দরজা খোলা অবস্থায় পড়ে আছে।

পুলিশের বক্তব্য

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মহিদুল ইসলাম বলেন,
“স্ট্রং রুম এলাকায় পুলিশের সরাসরি দায়িত্ব নেই, কারণ সেটি কাস্টমস ও বিমান নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের আওতাধীন। তবে বিমানবন্দর থানায় তালা ভাঙার ঘটনার একটি জিডি হয়েছে। আমরা ঘটনাটি তদন্ত করছি।”

তিনি আরও জানান, “ভেতর থেকে কিছু লুট হয়েছে কি না, তা আমরা এখনো নিশ্চিত নই। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না।”

তদন্তে ফরেনসিক দল

ঘটনার পর সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তারা তালা কাটার সরঞ্জামাদি উদ্ধার করে এবং সেগুলোকে আলামত হিসেবে সংগ্রহ করেছে। তদন্ত দল বলছে, তালা কাটা হয়েছে পেশাদার উপায়ে, যা কোনো অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের ইঙ্গিত দিতে পারে।

এদিকে, বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা বলছেন, স্ট্রং রুমে সাধারণত স্বর্ণ, হীরা, মূল্যবান বাণিজ্যিক নথি ও অস্ত্রের মতো উচ্চমূল্যের ও স্পর্শকাতর জিনিস রাখা হয়। এসব পণ্য বের করতে হলে একাধিক বিভাগের স্বাক্ষর লাগে, এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহুস্তরবিশিষ্ট।

অগ্নিকাণ্ডের পটভূমি

গত ১৮ অক্টোবর বিমানবন্দরের কার্গো হাউজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে বিপুল পরিমাণ পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই গোটা কার্গো কমপ্লেক্সে কড়া নিরাপত্তা জারি করা হয়।
স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় এবং বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো কর্মকর্তাও প্রবেশ করতে পারেন না।

তবে এমন কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই স্ট্রং রুমের তালা ভাঙা ঘটনাটি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে কে বা কারা ভল্টে প্রবেশ করেছে, কী উদ্দেশ্যে, তা নিয়ে এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দিশেহারা।

কর্মকর্তাদের উদ্বেগ

বিমানবন্দরের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন,
“এমন নিরাপত্তা পরিবেষ্টনের মধ্যে তালা ভাঙার ঘটনা সত্যিই রহস্যজনক। ভল্টের ভেতরে উচ্চমূল্যের অনেক জিনিস এবং সরকারি সংবেদনশীল নথি থাকে। সেগুলোর কোনোটি হারিয়ে গেলে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমস্যা তৈরি করতে পারে।”

অন্য এক কর্মকর্তা জানান,
“আমরা এখনও যাচাই করছি ভেতরের কোনো পণ্য বা নথি খোয়া গেছে কি না। এটি নিশ্চিত হতে পুরো ইনভেন্টরি পুনরায় করতে হবে।”

কী থাকতে পারে স্ট্রং রুমে

স্ট্রং রুমে সাধারণত সংরক্ষণ করা হয়—

  • আমদানি-সংক্রান্ত বাণিজ্যিক নথি ও শুল্ক কাগজপত্র
  • সরকারি ও সামরিক সংবেদনশীল দলিল
  • স্বর্ণ, হীরা বা অন্যান্য মূল্যবান পণ্য
  • আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য আমদানি করা আগ্নেয়াস্ত্র

এসব কারণে স্ট্রং রুমের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখা হয়। ফলে এই ঘটনার পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্তের দিক

পুলিশ, সিআইডি ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তিনটি পৃথক তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে, কেউ ভেতরের তথ্য জেনে পরিকল্পিতভাবে তালা ভেঙেছে। যদিও এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদের খবর পাওয়া যায়নি।

বিমানবন্দর থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে আসলে তদন্তের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে।

বিমানবন্দরের স্ট্রং রুমে তালা ভাঙার এই ঘটনা শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নয়, দেশের আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারের ওপরও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন সবার চোখ তদন্তের ফলাফলের দিকে—আসলে কিছু খোয়া গেছে কি না, আর গেলে তা কতটা বড় ক্ষতি ডেকে আনবে, সেই উত্তরই ঠিক করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।

Read Previous

বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্য অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ ভিসা প্রসেসিং: বিস্তারিত গাইডলাইন ও প্রয়োজনীয় তথ্য

Read Next

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ই-গেট চালু: নিরাপত্তা ও সেবা উন্নয়নে নতুন অধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular