
ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ প্রতিবেদক: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের আটটি বিমানবন্দরের রানওয়ে এখন রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাবার জমে রানওয়ে পিচ্ছিল হয়ে পড়ছে, যা বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। অথচ এসব রাবার অপসারণে প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় এখনো কোদাল-হাতুড়ির মাধ্যমে পরিষ্কার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রানওয়ে রক্ষণাবেক্ষণে এমন অব্যবস্থাপনা শুধু নিরাপত্তার প্রশ্নই নয়, দেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থার সার্বিক মান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রানওয়ে ঝুঁকির কারণ কী?
বিমান চলাচলের সময় চাকার ঘর্ষণে টায়ারের অংশবিশেষ ক্ষয় হয়ে রাবার আকারে রানওয়েতে জমে থাকে। একে বলা হয় রাবার ডিপোজিট। বেশি বৃষ্টিপাত বা তীব্র তাপমাত্রার সময় এই রাবার পিচ্ছিলতা তৈরি করে, ফলে উড্ডয়ন ও অবতরণে বিশাল ঝুঁকি দেখা দেয়।
নেই যন্ত্র, চলছে কোদাল দিয়ে পরিষ্কার
উন্নত দেশগুলোতে যেখানে হাই-প্রেশার ওয়াটার জেট, ভ্যাকুয়াম সিস্টেমসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রানওয়ে পরিষ্কার করা হয়, সেখানে বাংলাদেশে এখনো হাতেকলমে কোদাল দিয়ে এই রাবার সরানোর চেষ্টা করা হয়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে রাবার অপসারণের যন্ত্র কেনার জন্য একটি আবেদন জানানো হয়। তবে দীর্ঘ প্রায় দুই বছরেও সেই যন্ত্র আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো বাস্তবায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি নেই।
শুধু শাহজালাল নয়, সব বিমানবন্দরেই একই অবস্থা
শুধু হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর নয়, চট্টগ্রামের শাহ আমানত, সিলেটের ওসমানীসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোর অবস্থাও এক্ষেত্রে একই। অথচ এসব রানওয়েতে প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ওঠানামা করছে।
আন্তর্জাতিক মানে ঘাটতি
আইকাও’র (আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা) নিয়ম অনুযায়ী রানওয়ের ঘর্ষণ শক্তি নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে নামলে রানওয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং তখনই রাবার অপসারণ জরুরি হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এই ঘর্ষণ পরিমাপের যন্ত্রও সীমিত, ফলে সঠিক তথ্য নির্ণয় এবং ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মফিদুর রহমান বলেন, “আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী রানওয়ের রাবার অপসারণ একটি বাধ্যতামূলক রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া। কোদাল দিয়ে এই কাজ করতে গেলে রানওয়ে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।”
নিরাপত্তা ও ভাবমূর্তির প্রশ্ন
বিমান চলাচল শুধু অর্থনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি দেশের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতীকও বটে। তাই রানওয়ের সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতি শুধু যাত্রী নিরাপত্তা নয়, দেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আশার কথা: যন্ত্র কেনার উদ্যোগ
বেবিচকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ জানিয়েছেন, “হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্য একটি রাবার ডিপোজিট অপসারণ মেশিন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।” তবে অন্যান্য বিমানবন্দরগুলোর জন্য এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
পর্যটকদের পরামর্শ: যারা আকাশপথে ভ্রমণ করছেন, তাদের উচিত আবহাওয়া ও ফ্লাইট অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। বর্ষাকালে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা বিশেষভাবে জরুরি।
বিশেষ অনুরোধ: দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ও আধুনিকীকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, সে দাবি জানিয়েছেন এভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা ও সাধারণ যাত্রীরা।



