
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক :যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের বড় আকর্ষণ। ইয়েলোস্টোনের গিজার, গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের বিশালতা কিংবা ইয়োসেমাইটের পাহাড়ি সৌন্দর্য অনেকের ভ্রমণ তালিকার শীর্ষে থাকে। তবে চলতি বছরের শুরু থেকে কার্যকর হওয়া নতুন প্রবেশনীতি ও অতিরিক্ত ফি বিদেশি পর্যটকদের জন্য এই অভিজ্ঞতাকে অনেকটাই জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় জাতীয় উদ্যানগুলোতে বিদেশি দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
১ জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি প্রধান জাতীয় উদ্যানে বিদেশি পর্যটকদের জন্য আলাদা অতিরিক্ত ফি চালু করা হয়েছে। ইয়েলোস্টোন, গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, ইয়োসেমাইট, জায়ন, এভারগ্লেডস, আর্কেডিয়াসহ বহুল পরিচিত এসব উদ্যানে প্রবেশ করতে এখন বিদেশি দর্শনার্থীদের জনপ্রতি আরও ১০০ মার্কিন ডলার গুনতে হচ্ছে, যা বিদ্যমান প্রবেশ ফি–র সঙ্গে যোগ হচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ ১২ হাজার টাকারও বেশি, যা অনেক পর্যটকের জন্য বড় অঙ্কের ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ফি বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় উদ্যানে প্রবেশের সময় নতুন করে চালু হয়েছে পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া। পার্কের গেটেই এখন দর্শনার্থীদের আইডি পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হচ্ছে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা নন কি না। এই যাচাই ব্যবস্থা আগে এতটা কড়াকড়ি ছিল না। নতুন নিয়মের কারণে প্রবেশপথে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে, অনেক সময় পর্যটকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ভ্রমণকারীদের একটি বড় অংশ এই ভোগান্তিকে অপ্রত্যাশিত ও অস্বস্তিকর বলে বর্ণনা করছেন।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত ফি এবং জটিল প্রবেশপ্রক্রিয়ার খবর শুনেই অনেক বিদেশি পর্যটক তাদের পরিকল্পনা বাতিল করছেন। কেউ কেউ জাতীয় উদ্যানের পরিবর্তে শহরভিত্তিক ভ্রমণ বা অন্য দেশের গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে বা ছোট দলে ভ্রমণ করতে আসা পর্যটকদের জন্য খরচ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রবাহে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু উদ্যানে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জাতীয় উদ্যানগুলোর আশপাশে গড়ে ওঠা স্থানীয় অর্থনীতিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট, গাড়ি ভাড়া প্রতিষ্ঠান এবং ট্যুর অপারেটরদের আয় অনেকাংশেই বিদেশি পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল। দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে গেলে এসব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আয় কমার আশঙ্কা রয়েছে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থানেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় নতুন নীতির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে। তাদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করা এবং উদ্যানগুলোর দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধানের জন্য অতিরিক্ত রাজস্ব প্রয়োজন। নতুন ফি থেকে সংগৃহীত অর্থ জাতীয় উদ্যানগুলোর সংস্কার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মৌসুমভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হবে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এতে দীর্ঘমেয়াদে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা আরও উন্নত হবে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছেন। তাদের মতে, নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রবেশ প্রক্রিয়া অতিরিক্ত কঠিন হয়ে উঠলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন বাজারে পিছিয়ে পড়তে পারে। ইউরোপ, কানাডা কিংবা এশিয়ার অনেক দেশ তুলনামূলক সহজ ভিসা ও কম খরচে প্রাকৃতিক পর্যটন অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যানে নতুন ফি ও ইমিগ্রেশন-ভিত্তিক প্রবেশ নিয়ম একদিকে সরকারের রাজস্ব ও নিরাপত্তা লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হলেও অন্যদিকে বিদেশি পর্যটনের গতি শ্লথ করতে পারে। আগামী মাসগুলোতে এই নীতির বাস্তব প্রভাব কতটা গভীর হয়, তা পর্যটন খাত ও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।



