বিমান ও ভ্রমণ খাতে বড় পরিবর্তন: সরকার অনুমোদন দিল নতুন সংস্কার প্যাকেজ

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক | পর্যটন সংবাদ:বাংলাদেশের বিমান ও ভ্রমণ খাতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের সূচনা হলো বৃহস্পতিবার। উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন দিয়েছে দুটি বড় অধ্যাদেশের— ‘বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং ‘বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’।

এগুলো কার্যকর হলে খাতটিতে স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অভিবাসী কর্মী ও সাধারণ যাত্রীদের অধিকার সুরক্ষিত হবে বলে সরকার জানিয়েছে।

অভিবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় জোর

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা এস কে বশির সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমাদের দেশের বিমানযাত্রীদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই অভিবাসী শ্রমিক। তাই সংস্কারের মূল লক্ষ্যই তাদের সুরক্ষা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা।”
তিনি জানান, নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী টিকিট বিক্রয় ও মূল্য নির্ধারণে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকে আর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, টিকিট ব্লকিং বা অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের সুযোগ থাকবে না।

বিমান চলাচল আইনে বড় সংস্কার

২০১৭ সালের আইন সংশোধন করে বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ নতুন করে যুক্ত হয়েছে “যাত্রী পরিষেবা নিশ্চিত করা” বিষয়টি। এতে যাত্রীদের নিরাপত্তা, আরাম ও অধিকার রক্ষাকে আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
এছাড়া বিদেশি ও দেশীয় উভয় বিমান সংস্থার জন্য জেনারেল সেলস এজেন্ট (GSA) নিয়োগ ঐচ্ছিক করা হয়েছে— যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ডিজিটাল ব্যবস্থায় নজরদারি

টিকিট বিক্রি ও বিতরণে জবাবদিহিতা বাড়াতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (GDS), নিউ ডিস্ট্রিবিউশন ক্যাপাবিলিটি (NDC) ও API-ভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিবন্ধন।
এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে টিকিটের মূল্য, আসন প্রাপ্যতা এবং বিক্রয়ের হিসাব একক সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকবে, ফলে অনিয়ম বা জালিয়াতি শনাক্ত করা সহজ হবে।

পরিবেশবান্ধব নীতি ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ

নতুন আইনে প্রথমবারের মতো সরকারকে ‘সিভিল এভিয়েশন ইকোনমিক কমিশন’ গঠনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই কমিশন বিমানবন্দর ফি, চার্জ, রয়্যালটি ও ভাড়া নির্ধারণে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে।
এছাড়া পরিবেশগত টেকসইতা নিশ্চিত করতে বিমান সংস্থাগুলোকে কার্বন পদচিহ্ন কমানো, টেকসই জ্বালানি ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব অপারেশন নীতি গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন

বিমান চলাচল খাতকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করতে নতুন অধ্যাদেশে সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার ব্যবহার উৎসাহিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ মনে করছে, এর ফলে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়বে।

ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর জন্য কঠোর শাস্তি

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ জালিয়াতি, অননুমোদিত লেনদেন, তৃতীয় দেশের টিকিট কেনাবেচা, কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের মতো অপরাধে কঠোর শাস্তি রাখা হয়েছে।
এই অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ দশ লক্ষ টাকা জরিমানা এবং এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান থাকবে।

সংস্কার অনুযায়ী, সরকার এখন প্রমাণিত অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ট্রাভেল এজেন্সির নিবন্ধন সাময়িকভাবে স্থগিত করতে পারবে এবং প্রয়োজনে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ওপর অস্থায়ী ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন সচিব নাসরিন জাহান জানান, “এই দুটি অধ্যাদেশ শিকাগো কনভেনশন ও আইসিএও (ICAO)-র আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাত বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।”
তিনি আরও বলেন, “যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নয়নই এখন সরকারের অগ্রাধিকার।”

বড় পরিবর্তনের সূচনা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংস্কারগুলোর বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খল টিকিট বাজারে শৃঙ্খলা আসবে, প্রতারণা ও অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ বন্ধ হবে এবং অভিবাসী শ্রমিকরা ন্যায্য মূল্যে নিরাপদ ভ্রমণ করতে পারবেন।
একই সঙ্গে বিমান সংস্থা, ভ্রমণ এজেন্সি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে স্পষ্ট জবাবদিহিতা তৈরি হবে, যা খাতটিকে আরও টেকসই ও আধুনিক করবে।

এই নতুন আইন শুধু নিয়মের পরিবর্তন নয়—এটি বাংলাদেশের বিমান ও ভ্রমণ খাতে একটি নতুন যুগের সূচনা, যেখানে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও যাত্রীস্বার্থ একসঙ্গে এগিয়ে যাবে।

Read Previous

শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় আগ্রহী জাপানি কনসোর্টিয়াম সুমিতোমো

Read Next

নৌ ঐতিহ্যের নবজাগরণ: শতবর্ষী প্যাডেল স্টিমার ‘পি এস মাহসুদ’ আবার নদীপথে ফিরছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular