নৌ ঐতিহ্যের নবজাগরণ: শতবর্ষী প্যাডেল স্টিমার ‘পি এস মাহসুদ’ আবার নদীপথে ফিরছে

ঢাকা–বরিশাল রুটে আবারও ছন্দ ফিরিয়ে আনল ঐতিহাসিক প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ

পেডেল স্টিমার

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের নৌ ঐতিহ্যে নতুন অধ্যায় সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) হাতে নিয়েছে ঐতিহাসিক প্যাডেল স্টিমারগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ। শতবর্ষ পেরিয়ে আসা এই নৌযানগুলো শুধু পরিবহন মাধ্যম নয়, বরং বাংলাদেশের নদী সংস্কৃতির জীবন্ত সাক্ষ্য।

এরই ধারাবাহিকতায় সর্বপ্রথম ‘পি এস মাহসুদ’কে পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় মেরামত ও সংস্কারকাজ সম্পন্ন করে এটিকে প্রমোদতরী হিসেবে যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে।

বুধবার (১২ নভেম্বর) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে অবহিত করেন নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী এবং বিআইডব্লিউটিসি চেয়ারম্যান সলিম উল্লাহ।

প্রধান উপদেষ্টা ঐতিহ্যবাহী এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের নৌ ঐতিহ্য বিশ্বের নজর কাড়তে সক্ষম। আমাদের বৈচিত্র্যময় নৌকা ও স্টিমার ডিজাইন একসময় এ অঞ্চলের গর্ব ছিল। এখন সময় এসেছে সেই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরার।” তিনি আরও নির্দেশ দেন, প্যাডেল স্টিমারগুলোকে শুধু চলাচলের মাধ্যম হিসেবে নয়, ইতিহাস সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে।

তার মতে, প্রতিটি প্রমোদতরীতে যাত্রীদের জন্য থাকবে ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী—কবে এই স্টিমার তৈরি হয়, কোন রুটে চলত, কত ভাড়া ছিল, সেই সময়কার সামাজিক প্রেক্ষাপট কেমন ছিল—এসব গল্প জানার সুযোগ থাকবে। “যাত্রীরা যেন কেবল নদীর সৌন্দর্য উপভোগ না করে, বরং ইতিহাসের গভীরতাও অনুভব করে,” বলেন প্রধান উপদেষ্টা।

নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন জানান, পি এস মাহসুদ বাংলাদেশের নদী সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক। “এই স্টিমার শুধু একটি নৌযান নয়—এটি আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। নতুন প্রজন্ম যেন দেখে, একসময় নদীপথই ছিল দেশের প্রাণ।”

তিনি আরও বলেন, পি এস মাহসুদের পাশাপাশি পি এস অস্ট্রিচ ও পি এস লেপচাসহ আরও কয়েকটি পুরনো স্টিমার সংস্কারের কাজ পরিকল্পনায় রয়েছে। ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের কাপ্তাই লেকে প্রমোদতরী হিসেবে একটি প্যাডেল স্টিমার চালুর বিষয়েও ভাবা হচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, সংস্কার শেষ হলে এই প্রমোদতরীগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করবে। পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণের পাশাপাশি থাকবে ২ থেকে ৩ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত যাত্রার সুযোগ। সপ্তাহের প্রতিদিনই চলবে এসব প্রমোদতরী। এছাড়া বিশেষ দিনগুলোতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে আলাদা যাত্রার আয়োজন, যাতে তারা দেশের নৌ ঐতিহ্য সম্পর্কে সরাসরি জানতে পারে।

বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে প্রমোদতরীতে থাকছে নানা আয়োজন—বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার, লোকগানের পরিবেশনা, আর নদীপথের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। এর মাধ্যমে পর্যটন খাতেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শতবর্ষী এই প্যাডেল স্টিমারগুলোর পুনর্জাগরণ শুধু ইতিহাস সংরক্ষণ নয়, বরং এটি হতে পারে অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও নতুন উৎস। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, একই সঙ্গে নদীপথে সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ঘটবে।

বাংলাদেশ একসময় নদী ও নৌকার দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই ঐতিহ্য আজও জীবন্ত, কিন্তু আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার ভিড়ে তা হারিয়ে যাচ্ছিল। এখন এই পদক্ষেপ হয়তো আবার মনে করিয়ে দেবে—নদী কেবল জল নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং পরিচয়ের ধারক।

যখন পি এস মাহসুদ নতুন রূপে যাত্রা শুরু করবে, তখন শুধু নদীপথে একটি স্টিমার চলবে না—চলবে বাংলাদেশের শতবর্ষ পুরনো নৌ ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণের প্রতীক।

Read Previous

বিমান ও ভ্রমণ খাতে বড় পরিবর্তন: সরকার অনুমোদন দিল নতুন সংস্কার প্যাকেজ

Read Next

বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য টুভালু ভ্রমণ ভিসা প্রসেসিং: জানুন কাগজপত্র, ফি ও এম্বাসির সব তথ্য একসাথে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular