
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ঢাকার উত্তরা এলাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মো. সাফিকুর রহমান এবং তাঁর স্ত্রী বিথীর বাসায় একটি ১১ বছর বয়সী শিশু গৃহকর্মীকে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গত রোববার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ৭/সি রোডের বাসা থেকে সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বিথী এবং বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও মোছা. সুফিয়া বেগমকে গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। পরদিন সোমবার বিকেলে তাঁদের ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক রাজু আহমেদ জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে চারজনকেই কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার বাদী শিশুটির বাবা গোলাম মোস্তফা, যিনি একটি হোটেলে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। তাঁর অভিযোগ অনুসারে, গত বছরের জুন মাসে বাসার সিকিউরিটি গার্ড জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে সাফিকুর রহমানের পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হয়। জাহাঙ্গীর জানান যে, তাঁদের বাসায় ছোট একটি মেয়ে বাচ্চা দেখাশোনার জন্য প্রয়োজন। পরে সাফিকুর ও বিথী শিশুটির বাবাকে আশ্বাস দেন যে, মেয়েটির যাবতীয় খরচ, এমনকি ভবিষ্যতে বিয়ের খরচও তাঁরা বহন করবেন। দারিদ্র্যতার কারণে রাজি হয়ে গোলাম মোস্তফা তাঁর ১১ বছরের মেয়েকে ওই বাসায় পাঠান।
সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর শিশুটিকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন বাবা। এরপর থেকে বিভিন্ন অজুহাতে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। অবশেষে গত ৩১ জানুয়ারি দুপুর দেড়টার দিকে বিথী ফোন করে জানান, মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তাকে নিয়ে যেতে। বিকেল ২টার দিকে বাবা বাসায় গেলে বিথী বাইরে থাকার কথা বলে অপেক্ষা করতে বলেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাসার বাইরে এসে শিশুটিকে বুঝিয়ে দেন। তখন দেখা যায়, মেয়ের দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম, ছেঁকা দেওয়ার দাগ এবং মারধরের চিহ্ন। শিশুটি স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে পারছিল না। কী হয়েছে জানতে চাইলে বিথী কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
পরে গোলাম মোস্তফা মেয়েকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। হাসপাতালে চিকিৎসার সময় শিশুটি বাবাকে জানায়, নভেম্বরের পর থেকে সাফিকুর রহমান, বিথী এবং অন্যান্যরা অকারণে তাকে মারধর করতেন। গরম খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দেওয়া হতো। এসব নির্যাতনের কারণে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে।
এ ঘটনায় ১ ফেব্রুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন বাবা। মামলায় সাফিকুর রহমান, বিথী এবং অজ্ঞাতনামা আসামিদের নাম উল্লেখ করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রোবেল মিয়া আদালতে জানান, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তাঁদের নাম-ঠিকানা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। জামিনে মুক্তি পেলে মামলার তদন্তে বিঘ্ন ঘটবে এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাঁদের কারাগারে রাখা প্রয়োজন। আদালত এ আবেদন মঞ্জুর করেন।
এ ঘটনায় রুপালী খাতুনের দুটি শিশুসন্তান (২ বছর ও ৬ মাস বয়সী) অভিভাবকহীন হয়ে পড়ায় তাদেরও মায়ের সঙ্গে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এটি পরিস্থিতির আরও জটিলতা বাড়িয়েছে।
এই ঘটনা বাংলাদেশে শিশু অধিকার, গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা এবং দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে শোষণের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সামাজিক সংগঠন এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা দাবি করেছে যে, শিশু গৃহকর্মীদের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার। অনেকে মনে করছেন, উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের এমন অভিযোগে জড়িত হওয়া সমাজে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও জোরদার করার সুযোগ করে দিয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি, তবে এ ঘটনা সংস্থার ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তদন্ত চলমান রয়েছে এবং পুলিশ আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে। শিশুটির চিকিৎসা চলছে এবং তার সুস্থতার জন্য সবাই প্রার্থনা করছেন।



