বিমানবন্দর কার্গো শেডে আগুন: বৈদ্যুতিক ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা ও সাতটি আগুন—তদন্তে ভয়াবহ চিত্র

বিমানবন্দরে ভয়াবহ আগুন

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো শেডে ১৮ অক্টোবর যে আগুন লেগেছিল, তার তদন্ত রিপোর্ট এখন স্পষ্টভাবে বলছে—এটা নাশকতা নয়, পুরোপুরি বৈদ্যুতিক চাপ বৃদ্ধি এবং শর্ট সার্কিটের ফল। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে বুধবার প্রতিবেদন জমা দেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম। রিপোর্ট তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি দল।

রিপোর্টে উঠে এসেছে এমন সব তথ্য, যা দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। কার্গো শেডের উত্তর–পশ্চিম দিকে থাকা বর্ধিত কুরিয়ার শেডটিতে ছিল লোহার গ্রিল দেওয়া ৪৮টি ছোট অফিস। সেখানেই আগুনের উৎপত্তি। আর বিষয়টা যত খতিয়ে দেখা হয়েছে, ততই বোঝা গেছে—ঝুঁকির জায়গাটা বহুদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল। কারণ পুরো এলাকাতেই ছিল না কোনো ফায়ার অ্যালার্ম, স্মোক ডিটেক্টর, স্প্রিংকলার সিস্টেম বা কার্যকর হাইড্রেন্ট। তার মধ্যেই রাখা ছিল পলিথিনে মোড়ানো কাপড়ের রোল, রাসায়নিক, সুগন্ধি, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিক্স আর ওষুধের কাঁচামাল—সবই দাহ্য এবং উচ্চ ঝুঁকির।

আগুন প্রথম চোখে পড়ে আনসার সদস্যদের। সময় তখন দুপুর ২টা ১৫। সাত মিনিট পর সিএএবি–র প্রথম ফায়ার ট্রাক ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আর উত্তরা ফায়ার স্টেশন পুরো ৩৫ মিনিট পরে বিকেল ২টা ৫০ মিনিটে সেখানে পৌঁছায়। এর মধ্যেই আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দমকল কর্মীরা লড়াই করেছেন ১,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপে, লোহার গ্রিলের বাধা, পর্যাপ্ত পানি না থাকা, রাসায়নিকের অজানা ঝুঁকি আর আংশিক কাঠামো ধসের সঙ্গে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি ছিল প্রায় অপ্রবেশযোগ্য এবং জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন দমকল সদস্যরা।

তদন্ত দল ৯৭ জন সাক্ষীর বক্তব্য নিয়েছে, পর্যালোচনা করেছে সিসিটিভি ফুটেজ, সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস, বিমান, সিআইডি ফরেনসিক ইউনিট, ডেসকো, এনএসআই, সশস্ত্র বাহিনীর অগ্নিনির্বাপণ বিশেষজ্ঞ এবং বিদেশি সংস্থা এএফএডি–র বিভিন্ন তথ্য। আর এগুলো মিলিয়েই সামনে এসেছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য—২০১৩ সাল থেকে একই এলাকায় কমপক্ষে সাতটি বড় আগুন লেগেছে, যার বেশিরভাগেরই সরকারি রেকর্ড নেই। অর্থাৎ সমস্যা নতুন নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি অব্যবস্থাপনা, নজরদারির ঘাটতি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরে চলছে।

এ কারণে কমিটি বলেছে, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সক্ষমতা এমন জটিল ঝুঁকি মোকাবিলার মতো শক্তিশালী নয়। শুধু বিধান বা নির্দেশনাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। তাই তারা সুপারিশ করেছে—বিমানবন্দর পরিচালনার জন্য আলাদা একটি কর্তৃপক্ষ গঠন, সিএএবিকে নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় সীমাবদ্ধ রাখা, আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ-শ্রেণীর ফায়ার স্টেশন স্থাপন, ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম কার্গো এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং সীমাবদ্ধ অঞ্চলে দাহ্য জিনিসপত্র সংরক্ষণ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা।

মোটকথা, তদন্ত রিপোর্ট বলছে—এই আগুন ছিল না কোনো আকস্মিক বিপত্তি। বরং বহুদিনের গাফিলতি, দুর্বল অবকাঠামো আর শৃঙ্খলা ভাঙা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফল। এই ঘটনার পর যদি সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে একই ধরনের বিপর্যয় আবারও ঘটতে পারে—এমন সতর্ক বার্তাও রেখেছে তদন্ত কমিটি।

Read Previous

পঞ্চগড়ে শীতের আগমনী বার্তা: দিনে গরম, রাতে কাঁপুনি—তাপমাত্রা নামছে দ্রুত

Read Next

বাংলাদেশের সামনে বড় সিদ্ধান্ত: বোয়িং নাকি এয়ারবাস—কোন পথে যাবে দেশের বিমান পরিবহন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular