
ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশ এখন এমন এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে নতুন সরকার গঠনের আগেই জাতীয় বিমান পরিবহন খাতে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি নিতে হতে পারে। প্রশ্নটা সরল—২৫টি বোয়িং কিনবে দেশ, নাকি ১৪টি এয়ারবাস? কিন্তু এর ভেতরের হিসাব এতটাই জটিল যে এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; সঙ্গে রয়েছে কূটনৈতিক টানাপোড়েন, আর্থিক চাপ, বহর পরিকল্পনা, ভবিষ্যৎ রুট সম্প্রসারণ এবং দেশের এভিয়েশন শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।
বোয়িংয়ের প্রস্তাব: বড় সংখ্যা, দীর্ঘ অপেক্ষা
ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার পর বাংলাদেশ সরকার ২৫টি বোয়িং কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর মধ্যে ১০টি 787 সিরিজের ওয়াইড-বডি এবং ৪টি 737 MAX ন্যারো-বডি ইতোমধ্যে নিশ্চিত। বাকি সংখ্যাগুলোর বিন্যাস এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
বোয়িংয়ের মূল সুবিধা হলো—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বর্তমান বহর বোয়িং-নির্ভর। ১৯টি বিমানের মধ্যে ১৪টিই বোয়িং। অর্থাৎ অবকাঠামো, পাইলট ট্রেনিং, মেইনটেন্যান্স, যন্ত্রাংশ—সবই আগে থেকেই স্থাপিত। নতুন বিমান এলে বিঘ্ন কম হবে।
তবে বড় প্রশ্ন সময়। অর্ডার নিশ্চিত করলেও ডেলিভারি শুরু ২০২৯ সালে। পাঁচ বছর পর থেকে বহর বাড়ানো শুরু হলে দেশের রুট পরিকল্পনা, প্রতিযোগিতামূলক বাজার দখল অথবা নতুন রুট খোলার প্রকল্পগুলো আরও বিলম্বিত হবে।
এয়ারবাসের পাল্টা চাপ: কম বিমান, কিন্তু দ্রুত রাজনৈতিক সমর্থন
বোয়িং–ঘোষণার পর এয়ারবাস দ্রুত মাঠে নামে। তাদের প্রস্তাব—১০টি A350 ওয়াইড-বডি এবং ৪টি A320neo ন্যারো-বডি। সংখ্যা কম হলেও লবিং অনেক শক্তিশালী। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য এবং ইইউ রাষ্ট্রদূতরা প্রকাশ্যে এয়ারবাসের পক্ষে অবস্থান নেন এবং বলেন—বাংলাদেশের বহর বৈচিত্র্য আনার সময় এসেছে।
ইইউ রাষ্ট্রদূতরা যুক্তি দেন, ইউরোপ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যও বিশাল—২২.২ বিলিয়ন ইউরো। তাই প্রতিযোগিতার একই সুযোগ নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় প্রযুক্তিকে সুযোগ দেওয়া উচিত।
এয়ারবাসের আরেকটি কৌশলগত দিক হলো—আগের সরকারের সাথে ১০টি এয়ারবাস কেনার প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি এখন ১৪-বিমানের প্রস্তাবে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে ইউরোপ দেখাতে চাইছে, তারা নতুন নয়—বরং বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব দিতে চায়।
সংখ্যা বড়, কিন্তু খরচ আরও বড়
এয়ারবাসের ১৪টি বিমানের ক্যাটালগ মূল্য ধারনা করলে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার। যদিও বাস্তবে বিমান সংস্থাগুলো উল্লেখযোগ্য ছাড় নিয়ে থাকে।
অন্যদিকে বোয়িংের ২৫টি বিমানের আর্থিক চুক্তি প্রকাশ করা হয়নি। তবে সংখ্যা বেশি হলে খরচও বেশি—এটা স্পষ্ট।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আদৌ এই বিনিয়োগ বহন করতে পারবে কি?
কারণ—
- CAAB-এর কাছে বিমানের বকেয়া ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি
- এর ৭৯% শুধু পুরনো বিলের ওপর সারচার্জ
- সম্প্রতি ঢাকা–নারিতা রুট বন্ধ হয়েছে লোকসানের কারণে
- বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব এয়ারলাইন্সগুলোর শেয়ার মাত্র ২৫%
একটি এত বড় বহর সম্প্রসারণ—এটি কেবল চুক্তির বিষয় নয়; দরকার আর্থিক সক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন, রুট পরিকল্পনা এবং কার্যকরী ব্যবস্থাপনা।
বহর বৈচিত্র্য বনাম বহর সরলতা—চাপ দুই দিকেই
বিমান বর্তমানে মূলত বোয়িং-নির্ভর।
সুবিধা—সরঞ্জাম, ট্রেনিং, খুচরা যন্ত্রাংশ—সবই প্রস্তুত।
অসুবিধা—একটি ব্র্যান্ডের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বিশ্বব্যাপী অনেক বিমান সংস্থাই এখন কমাচ্ছে।
এয়ারবাস যুক্তি দিচ্ছে—দুটি নির্মাতার বিমান থাকলে ঝুঁকি ভাগ হয়, বিভিন্ন রুটে ভিন্ন ধরনের জ্বালানি দক্ষ মডেল ব্যবহার করা যায়। এমনকি দেশের ব্যস্ত সিভিল এভিয়েশন বাজারে নতুন প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব গড়ে ওঠে।
বোয়িংয়ের যুক্তি বিপরীত—একক বহর নীতি সহজ, খরচ কম, অভিযোজন দ্রুত।
বাংলাদেশ কোন পথে যাবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: সিদ্ধান্তটি যেন কূটনীতির স্কোর শিটে না পড়ে
কয়েকজন সাবেক পাইলট ও বোর্ড সদস্য স্পষ্ট করে বলছেন—এটি কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।
অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার এটিএম নজরুল ইসলামের কথা সরল:
যদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা বিমান কেনার সঙ্গেই বাঁধা হয়, তাহলে এয়ারবাসও স্বাভাবিকভাবেই একই চাপ দেবে। এতে ঝুঁকি বাড়ে।
প্রাক্তন বোর্ড সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলমের মন্তব্য আরও কঠিন:
“নতুন বিমান এনে লাভ হবে না, যদি বিমান সেগুলো কার্যকরভাবে চালাতে না পারে।”
অর্থাৎ বহর বাড়ানোর আগে অপারেশনাল দুর্বলতা দূর করা জরুরি।
দুই নির্মাতার কৌশলগত অবস্থান
এয়ারবাস ইতিমধ্যেই বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের আশ্বাস দিচ্ছে। তাদের বিক্রয় নির্বাহীরা নিয়মিত ঢাকায় এসে প্রস্তাব ব্যাখ্যা করছেন।
বোয়িংও পিছিয়ে নেই—যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ বড় খেলোয়াড় না হলেও ভূ-রাজনৈতিক বন্ধুত্বের বড় অংশ এখন এভিয়েশনের সঙ্গেই যুক্ত।
উভয় সংস্থারই লক্ষ্য পরিষ্কার—দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুতবর্ধনশীল এভিয়েশন বাজারে বাংলাদেশকে স্থায়ী গ্রাহক হিসেবে ধরে রাখা।
সামনে কোন পথ?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আপাতত নীরব। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কেউ প্রকাশ্যে বলতে চাইছে না—চুক্তি এগোবে, নাকি বিরতি দেবে, নাকি নতুন মূল্যায়ন হবে।
কিন্তু সময় কম।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে তিনটি পথে ভাবতে হবে—
২৫-বোয়িং চুক্তি ধরে রাখা সুবিধা—পরিচালনায় একরূপতা, দ্রুত অভিযোজনঅসুবিধা—ইউরোপীয় অসন্তোষ, বহর বৈচিত্র্যের অভাব
১৪-এয়ারবাস অর্ডারে যাওয়াসুবিধা—বহর বৈচিত্র্য, ইউরোপীয় সমর্থনঅসুবিধা—নতুন অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যয়
মিশ্র কৌশল- বিশ্বে অনেক বড় বিমান সংস্থা দুই নির্মাতাকেই ব্যবহার করে।বাংলাদেশও চাইলে ২৫-বোয়িং বা ১৪-এয়ারবাসের সংখ্যা পুনর্গঠনের মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ পথ নিতে পারে।
বাংলাদেশ কোন নির্মাতাকে বেছে নেবে তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু স্পষ্ট একটি বিষয়—সিদ্ধান্তটি শুধু বিমান কেনার চুক্তি নয়। এটি আগামী ২০–২৫ বছরের বিমান নীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, রুট সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান, মুনাফা এবং জাতীয় এভিয়েশন ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের প্রতিযোগিতার মাঝে বাংলাদেশ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য বহু বছর ধরে দিতে হতে পারে। আর সঠিক সিদ্ধান্ত দেশের বিমান খাতকে নতুন উড়ান দিতে পারে।



