বান্দরবানে সাংগ্রাইং উৎসব নিয়ে মারমা সম্প্রদায়ে উদ্বেগের ঘনঘটা, সংঘাতের আশঙ্কায় থমকে প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিনিধি। পর্যটন সংবাদ : বান্দরবানের পাহাড়ি উপত্যকায় মারমা সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসব সাংগ্রাইং বা বৈসাবি ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কালো মেঘ জমেছে। বিএনপি-সমর্থিত দুটি পৃথক কমিটি একই স্থানে, একই সময়ে উৎসব আয়োজনের ঘোষণা দেওয়ায় স্থানীয় সমাজে বিভ্রান্তি, উদ্বেগ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তীব্র হয়ে উঠেছে। আগামী ১৩ এপ্রিল থেকে চার দিনব্যাপী এই উৎসব শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দ্বন্দ্বের কারণে এখনো কোনো দৃশ্যমান প্রস্তুতি চোখে পড়ছে না। সাধারণত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলে এই উৎসবের প্রস্তুতি, কিন্তু এবার রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের কারণে সেই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন থমকে গেছে। স্থানীয় মারমা সম্প্রদায়ের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং উৎসবকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

সাংগ্রাইং উৎসব মারমা সম্প্রদায়ের জীবনধারায় এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়, বরং পুরোনো বছরের দুঃখ-কষ্ট ধুয়ে নতুন করে শুরু করার প্রতীক। পাহাড়ের সবুজ বনানী, ঝিরিঝিরি নদী আর ঐতিহ্যবাহী মারমা সংস্কৃতির মেলবন্ধনএই উৎসবে ফুটে ওঠে। নাচ-গান, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, খাবারের আয়োজন এবং সামাজিক মিলনের মাধ্যমে সম্প্রদায়ের ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করে তোলে এই উৎসব। কিন্তু এবার সেই ঐক্যের উৎসবকেই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বলি হতে দেখা যাচ্ছে। বিএনপি-সমর্থিত দুটি কমিটি রাজারমাঠে একই দিনে উৎসব আয়োজনের ঘোষণা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ পুরোনো কমিটির নেতৃত্বে এবং অন্য পক্ষ নতুন কমিটির সভাপতির নেতৃত্বে আয়োজন করতে চাইছে। এই দ্বন্দ্বের ফলে উৎসবের আয়োজন নিয়ে সামাজিক বিভাজনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে মারমা সম্প্রদায়ের সুশীল সমাজের ৫৮ জন প্রতিনিধি উভয় পক্ষকে আলোচনায় বসার জন্য লিখিত আহ্বান জানিয়েছেন। চলতি ২৩ মার্চ তারিখে উভয় কমিটিকে চিঠি দিয়ে তাঁরা জানান, একই সময়ে ও একই স্থানে দুটি আয়োজন হলে বিভ্রান্তি ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য দূর করে একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করা উচিত। এতে সামাজিক বিভাজন এড়ানো সম্ভব হবে এবং উৎসব তার স্বাভাবিক গৌরবে উদযাপিত হবে। সুশীল সমাজের এই আহ্বানে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন মানবাধিকারকর্মী অং চ মং মারমা। তিনি জানান, গত বছর সাংগ্রাইং উৎসব আয়োজনে দুই বছরমেয়াদি একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু চলতি ১২ মার্চ হঠাৎ নতুন আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তের কারণে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, উৎসবের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি।

আরেক স্বাক্ষরকারী সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান থোয়াইংচপ্রু মাস্টার জানান, লিখিত আহ্বান জানানো সত্ত্বেও এখনো কোনো পক্ষ থেকে সাড়া মেলেনি। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরীকেও অবহিত করা হয়েছে, কিন্তু তাঁর পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এই নিষ্ক্রিয়তা স্থানীয় সমাজকে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, উৎসবের ঐতিহ্য রক্ষায় উভয় পক্ষের মধ্যে তাৎক্ষণিক আলোচনা অপরিহার্য। অন্যথায় সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে এবং পাহাড়ি অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ব্যাহত হবে।

এদিকে পুরোনো কমিটির সভাপতি বলেন, তাঁরা সবসময় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পক্ষে। কেউ যদি উদ্যোগ নেয় তাহলে তাঁরা স্বাগত জানাবেন। তিনি উল্লেখ করেন, গত বছরের কমিটি সফলভাবে উৎসব আয়োজন করেছিল এবং এবারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চান। অন্যদিকে নতুনকমিটির সভাপতি জানান, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন কমিটি গঠন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এবারের কমিটি সংসদ সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছে। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যের মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তিতে যেকোনো সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। তাই সুশীল সমাজের নেতাদের সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পথে এগোনো উচিত।

বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরী অবশ্য পাল্টাপাল্টি কমিটির অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটি কমিটি হয়েছিল এবং নতুন সরকারের সময়ে নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে। তাঁর মতে, নতুন কমিটিকে সবাই সহযোগিতা করবে এবং উৎসব আয়োজনের দায়িত্ব কমিটিরই। সংসদ সদস্যের এই বক্তব্যে সুশীল সমাজের আহ্বান আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ কোনো পক্ষই সরাসরি আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি। ফলে উৎসবের মাত্র কয়েক দিন আগে এখনো কোনো প্রস্তুতি শুরু হয়নি। রাজারমাঠে সাজসজ্জা, মঞ্চ তৈরি বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কোনো আয়োজন চোখে পড়ছে না। সাধারণ মারমা যুবক-যুবতীরা এই অনিশ্চয়তায় হতাশ। তাঁরা মনে করেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে তাঁদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই দ্বন্দ্বের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল যেন পাহাড়ি সম্প্রদায়ের উৎসবকে ছুঁয়ে গেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে কমিটি গঠনের প্রবণতা সাধারণ ঘটনা হলেও তা যদি উৎসবের মতো অরাজনৈতিক অনুষ্ঠানকে প্রভাবিত করে তাহলে তা দুঃখজনক। মারমা সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, উৎসবের আয়োজন কোনো রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া অধিকার নয়। এটি সম্প্রদায়ের সকল সদস্যের সাধারণ সম্পত্তি। তাই দুই কমিটির মধ্যে সমন্বয় না হলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় এমন ঘটনা এড়ানো জরুরি।

উৎসবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে অনেকে মনে করেন, এই দ্বন্দ্ব শুধু আয়োজন নয়, বরং মারমা সংস্কৃতির অস্তিত্বকেও চ্যালেঞ্জ করছে। সাংগ্রাইং উৎসবে অংশ নিয়ে যুবসমাজ তাঁদের ঐতিহ্য শেখে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংস্কৃতি বহন করে। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ যদি এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে তাহলে ভবিষ্যতে সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ আরও গভীর হতে পারে। সুশীল সমাজের আহ্বান অনুসারে যদি উভয় পক্ষ শিগগিরই আলোচনায় বসে তাহলে সমস্যার সমাধান সম্ভব। অন্যথায় উৎসবের আনন্দময় পরিবেশ বিঘ্নিত হবে এবং স্থানীয় প্রশাসনকেও হয়তো হস্তক্ষেপ করতে হবে।

বান্দরবানের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনে সাংগ্রাইং উৎসবের মতো অনুষ্ঠানগুলো শুধু উৎসব নয়, বরং জীবনের অংশ। এই উৎসবকে ঘিরে যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে তা সমাধান না হলে সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে। স্থানীয় নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা আশাকরছেন, সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সকলে দ্রুত উদ্যোগ নেবেন যাতে উৎসব তার মর্যাদা ফিরে পায়। মারমা সম্প্রদায়ের হাজার বছরের ঐতিহ্য যেন কোনো রাজনৈতিক খেলার বলি না হয়—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা। উৎসবের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উদ্বেগ। সুশীল সমাজের আহ্বান যদি কার্যকর হয় তাহলে পাহাড়ে আবার শান্তির সুর বেজে উঠবে। অন্যথায় সাংগ্রাইংয়ের আলোকিত আয়োজন হয়ে উঠতে পারে অন্ধকারময় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

প্রতিবেদক : ইসলাম রাইসুল

Read Previous

নভোএয়ারের আকর্ষণীয় অফার: মাত্র ২৩২৩ টাকার মাসিক কিস্তিতে কক্সবাজার ভ্রমণ

Read Next

বিমানকে লাভজনক ও যাত্রীবান্ধব করতে মন্ত্রীর আহ্বান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular