১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ভারতের মাটিতে খেলতে না যাওয়ায় ভারতের ক্রীড়া পর্যটন: লাভ না ক্ষতি—বাস্তব চিত্র

স্পোর্টস ট্যুরিজম

ছবি : Aiজেনারেটেড

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : ভারতের ক্রিকেট মানেই শুধু খেলা নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ও পর্যটন ইকোসিস্টেম। আন্তর্জাতিক সিরিজ মানে স্টেডিয়ামভর্তি দর্শক, হোটেল বুকিং, ফ্লাইট টিকিট, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় পরিবহন, স্মারক সামগ্রী—সবকিছুর সম্মিলিত গতি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ক্রিকেট দল ভারতের মাটিতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ক্রীড়া পর্যটনে কী প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিষয়টি একমাত্রিক নয়। এখানে আছে ক্ষতি, আছে সীমিত লাভও। চলুন, ছবিটা পরিষ্কার করি।

প্রথমেই ক্ষতির দিকটা দেখা যাক। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ম্যাচ মানেই উপমহাদেশজুড়ে আগ্রহের বিস্ফোরণ। এই ম্যাচগুলো ঘিরে দর্শকসংখ্যা সাধারণত বেশি হয়, টিকিটের দাম চড়া থাকে, করপোরেট বক্স ও স্পনসরশিপ দ্রুত বিক্রি হয়। বিশেষ করে পাকিস্তান–ভারত ম্যাচ তো ক্রীড়া পর্যটনের দৃষ্টিতে ‘প্রিমিয়াম ইভেন্ট’। এই ধরনের ম্যাচ না হওয়ায় ভারতের বিভিন্ন শহরে প্রত্যাশিত পর্যটক প্রবাহ কমে যাবে। দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু—এই শহরগুলোতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ হলে আশপাশের রাজ্য থেকেও দর্শক আসেন। হোটেল, গেস্টহাউস, এয়ারবিএনবি ধরনের আবাসনে যে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়, তা আর থাকবে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিদেশি দর্শক। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সমর্থক সাধারণত ভারতে খেলা দেখতে আসেন। তারা শুধু ম্যাচই দেখেন না, সুযোগ পেলে শপিং করেন, ঐতিহাসিক স্থান ঘোরেন, চিকিৎসা বা পারিবারিক কাজও সেরে নেন। এই ক্রস-বর্ডার ক্রীড়া পর্যটন বন্ধ হলে ভারতের পর্যটন খাত সরাসরি একটি বাজার হারাবে। এটি বিশেষ করে সীমান্তবর্তী বা ঐতিহাসিক ক্রিকেট ভেন্যু শহরগুলোর জন্য বেশি ক্ষতিকর।

আরেকটি বড় ক্ষতি ব্রডকাস্ট ও স্পনসরশিপ ইকোসিস্টেমে। ভারতীয় বাজার শক্তিশালী হলেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দর্শক যুক্ত থাকলে টিভি রেটিং এবং ডিজিটাল ভিউ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। সেই বাড়তি রিচের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপনদাতারা বেশি বিনিয়োগ করে। ম্যাচ না হলে বা নিরপেক্ষ ভেন্যুতে হলে ভারতের অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া পর্যটনের সঙ্গে সেই অর্থপ্রবাহ সরাসরি যুক্ত থাকে না। ফলে স্থানীয় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ভেন্যু অপারেশন, অস্থায়ী কর্মসংস্থান—সবখানেই প্রভাব পড়ে।

তবে এখানেই গল্প শেষ নয়। সীমিত হলেও কিছু লাভের দিকও আছে। প্রথমত, ভারতের অভ্যন্তরীণ ক্রিকেট ক্যালেন্ডারে জায়গা তৈরি হয়। এই সময়টা আইপিএল, ঘরোয়া টুর্নামেন্ট, বা অন্য দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। আইপিএল ক্রীড়া পর্যটনের দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সিরিজের চেয়েও বড়। বিদেশি খেলোয়াড়, বিদেশি দর্শক, মিডিয়া—সব মিলিয়ে শহরভিত্তিক অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। বাংলাদেশ বা পাকিস্তান সিরিজ না থাকলে এই বিকল্প ইভেন্টগুলোর জন্য লজিস্টিক ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা সহজ হয়।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক জটিলতা কমে। ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ মানেই বাড়তি নিরাপত্তা, বিশেষ প্রস্তুতি, কখনো কখনো ভিসা ও যাতায়াত সংক্রান্ত কড়াকড়ি। এই সব ব্যবস্থাপনার খরচ শেষ পর্যন্ত ইভেন্টের মোট লাভ কমিয়ে দেয়। সেই ঝামেলা না থাকলে কিছু রাজ্য সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন স্বস্তি পায়। তারা তুলনামূলক কম ঝুঁকির ইভেন্টে মনোযোগ দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্রীড়া পর্যটনের অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।

তৃতীয় একটি দিক হলো দর্শক বৈচিত্র্য। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ম্যাচ না থাকলে ভারত নতুন বাজারের দিকে নজর দিতে পারে—অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, কিংবা উদীয়মান ক্রিকেট দেশগুলোর সঙ্গে সিরিজ আয়োজন। এসব দেশের দর্শকরা সাধারণত বেশি খরচ করেন এবং দীর্ঘ সময় থাকেন। ফলে হাই-ভ্যালু ট্যুরিজম তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। যদিও সংখ্যায় তারা কম, কিন্তু প্রতি পর্যটকের ব্যয় বেশি হওয়ায় কিছু শহরে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়।

তবু বাস্তবতা হলো, উপমহাদেশীয় ম্যাচের আবেগ ও ভলিউম অন্য কোনো সিরিজ পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে ম্যাচ মানে ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার, সংগীত—সবকিছুর মিল। এই মিল থেকেই তৈরি হয় বিশেষ ধরনের ক্রীড়া পর্যটন, যা শুধু ম্যাচের ৮–১০ ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি কয়েক দিনের উৎসবের মতো। সেই অভিজ্ঞতা না থাকলে ভারতের ক্রীড়া পর্যটনের একটি বড় ও অনন্য অংশ নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

দীর্ঘমেয়াদে আরেকটি ঝুঁকি আছে। যদি নিয়মিতভাবে এই দেশগুলো ভারতে খেলতে না আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে ভারতের কিছু ভেন্যু কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। বড় ম্যাচ না হলে মিডিয়া কাভারেজও কমে। এতে শহরগুলোর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ক্রীড়া পর্যটন কেবল তাৎক্ষণিক আয় নয়, এটি শহরের ইমেজ তৈরিরও একটি মাধ্যম।

সব মিলিয়ে হিসাবটা ভারসাম্যের। স্বল্পমেয়াদে ভারতের ক্রীড়া পর্যটনে স্পষ্ট ক্ষতি হবে—বিশেষ করে দর্শকসংখ্যা, হোটেল বুকিং, স্থানীয় ব্যবসা ও সীমান্তপারের পর্যটক প্রবাহে। কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প ইভেন্ট ও নিরাপত্তা সুবিধার কারণে সীমিত লাভ পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তা উপমহাদেশীয় হাই-ভলিউম ম্যাচের শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। ভারতের ক্রীড়া পর্যটনের শক্তি তার বৈচিত্র্যে, আর বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সেই বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অংশ অনুপস্থিত থাকলে লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লাই ভারী থাকবে—এটাই বাস্তব মূল্যায়ন।

প্রতিবেদক : আহাদ হোসেন খান

Read Previous

মার্কিন ভিসা কড়াকড়িতে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, চাপে বাংলাদেশ

Read Next

বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মুখে বাংলাদেশের বিমান চলাচল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular