
বাংলাদেশ দ্রুত বিকাশমান বিমান খাত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান বিমান খাতের ভবিষ্যৎ রক্ষায় বিদেশী বিমান সংস্থাগুলিকে পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্বাধীনতার ট্রাফিক অধিকার প্রদানে সতর্কতার আহ্বান জানিয়েছেন বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অকাল উদারীকরণ দেশের নিজস্ব বিমান শিল্পকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পঞ্চম স্বাধীনতা অনুযায়ী, কোনো বিদেশী বিমান সংস্থা তাদের নিজস্ব দেশের বাইরে দুটি দেশের মধ্যে যাত্রী পরিবহন করতে পারে, যদি সেটি তাদের মূল রুটের অংশ হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাংকক-ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটে কোনো বিদেশী সংস্থা চাইলে ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু পর্যন্ত যাত্রী বহন করতে পারবে, যা সরাসরি বাংলাদেশের নিজস্ব এয়ারলাইনগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে। ষষ্ঠ স্বাধীনতা আরও এক ধাপ এগিয়ে, যেখানে কোনো সংস্থা তাদের নিজস্ব দেশের মাধ্যমে দুটি বিদেশী দেশের মধ্যে যাত্রী পরিবহন করতে পারে।
আইএটিএ (IATA)-র তথ্য অনুযায়ী, আগামী দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের বিমান যাত্রী সংখ্যা বর্তমান ১ কোটি ২৫ লক্ষ থেকে দ্বিগুণ হয়ে ২ কোটি ৫০ লক্ষে পৌঁছাবে। এই প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বিদেশী বিমান সংস্থাগুলির কাছে বাংলাদেশের আকাশপথকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর আগে দেশের নিজস্ব বিমান সংস্থাগুলির শক্ত ভিত্তি তৈরি করা জরুরি।
শিল্প বিশ্লেষকদের বক্তব্য, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার বা তুরস্কের মতো দেশগুলো পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্বাধীনতা কৌশলগতভাবে ব্যবহার করেছে—কিন্তু তারা তা করেছে শক্তিশালী জাতীয় এয়ারলাইন, আধুনিক অবকাঠামো এবং সুসংগঠিত নীতিমালার ওপর দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন; দেশটির বিমান শিল্প এখনও বিকাশমান, এবং স্থানীয় অপারেটররা এখনো বিশ্বমানের প্রতিযোগিতার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
একজন বিমান নীতি বিশ্লেষক বলেন, “বিদেশী এয়ারলাইনগুলো যদি এখন থেকেই এই অধিকার পায়, তারা বাংলাদেশের বাজারের বড় অংশ দখল করে ফেলবে। ফলে দেশের নিজস্ব এয়ারলাইনগুলো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন রাজস্ব হারাবে, এবং বৈদেশিক মুদ্রা বহির্গমন বাড়বে।”
বর্তমানে বাংলাদেশে কার্যরত চারটি প্রধান স্থানীয় বিমান সংস্থা—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার এবং এয়ার অ্যাস্ট্রা—ইতিমধ্যেই উচ্চ জ্বালানি খরচ, সীমিত অবকাঠামো এবং ট্যাক্সের চাপের কারণে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। যদি বিদেশী সংস্থাগুলিকে আরও বিস্তৃত অধিকার দেওয়া হয়, তাহলে স্থানীয় সংস্থাগুলির লোড ফ্যাক্টর (সিট পূরণ হার) কমে যেতে পারে এবং লাভজনকতা হ্রাস পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB) এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে কেবলমাত্র পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার পরই এই ধরনের অধিকার দেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো দেশ বাংলাদেশের বিমান সংস্থাগুলিকে তাদের বাজারে একই সুবিধা দেয়, তবেই সমঝোতা করা উচিত।
এছাড়া, বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খরচ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। জ্বালানির উপর অতিরিক্ত কর, এয়ারপোর্ট চার্জ এবং আমদানি খরচের কারণে স্থানীয় সংস্থাগুলি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে কর ছাড়, নীতিগত প্রণোদনা এবং অবকাঠামোগত সহায়তা এখন সময়ের দাবি।
সব মিলিয়ে, বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কার করে দিয়েছেন—বাংলাদেশের বিমান খাত এখন একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। এই মুহূর্তে ভুল নীতি গ্রহণ করলে দেশের নিজস্ব এয়ারলাইন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ আরও বাড়বে। তাই এখনই প্রয়োজন দূরদর্শী ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি, যেখানে জাতীয় স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি—উভয়ই সুরক্ষিত থাকবে।



