
ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ২৫টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করছে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে দেশের এভিয়েশন খাতে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা—এটিকে কেউ দেখছেন ভবিষ্যতের অগ্রযাত্রা হিসেবে, আবার কেউ বলছেন, এটি ‘ঋণফাঁদের’ দিকে এক সাহসী কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ।
কেন এই সিদ্ধান্ত?
সরকারি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি পণ্যে সম্ভাব্য ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় অর্ডার দিয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে এই বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুরুতে ১৪টি উড়োজাহাজের কথা থাকলেও এখন তা বাড়িয়ে ২৫টি করা হয়েছে।
কী ধরনের বিমান আসছে?
সূত্র জানায়, এই বহরে থাকবে ১০টি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ও ১৫টি ৭৩৭ ম্যাক্স সিরিজের উড়োজাহাজ। বোয়িংয়ের মূল্য তালিকা অনুযায়ী, মোট খরচ দাঁড়াতে পারে ৪.৭৪ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে চূড়ান্ত দর-কষাকষিতে কিছু ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থ আসবে কোথা থেকে?
এত বিশাল বিনিয়োগের অর্থায়নের জন্য পরিকল্পনায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিম ব্যাংক, বিদেশি ব্যাংক থেকে ঋণ এবং সরকারি ভর্তুকি। তবে বিমান এখনো আগের বোয়িং কেনার ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করতে পারেনি। তাই বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন এই ঋণ ভবিষ্যতে বিমানের জন্য গুরুতর আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আর্থিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা
বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ২১টি উড়োজাহাজ। নতুন ২৫টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে পুরো ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। অথচ বিমানের রয়েছে পাইলট, প্রকৌশলী ও গ্রাউন্ড স্টাফ সংকট। রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায় রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। অধিকাংশ রুটে লোড ফ্যাক্টর ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতিটি ফ্লাইটেই গড়ে এক-তৃতীয়াংশ আসন ফাঁকা থাকে।
এছাড়া, বিমানের কয়েকটি ড্রিমলাইনার বর্তমানে অলস অবস্থায় হ্যাঙ্গারে পড়ে রয়েছে। ফলে নতুন বহর যদি সঠিক পরিকল্পনায় ব্যবহৃত না হয়, তবে সেগুলোও একই পরিণতির শিকার হতে পারে।
রুট সম্প্রসারণ না হলে কি হবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন উড়োজাহাজ আনার আগে বিমানের উচিত ছিল রুট সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক পার্টনারশিপ, কর্মী দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মুনাফা বাড়ানো। তা না করে সরাসরি বহর বাড়ানো ভবিষ্যতে বড় দায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট ছাড়া দেশের অন্য বিমানবন্দরগুলোও এখনো বড় ড্রিমলাইনার পরিচালনার উপযোগী নয়।
বিমান কি আসলেই লাভজনক?
বিমান বলছে, তারা লাভে রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় হয়েছে ১০ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা, নিট মুনাফা ২৮২ কোটি টাকা। তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, বিমান আসলে আয়ের বড় অংশ অর্জন করছে বিমানবহির্ভূত সহায়ক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, মূল এয়ারলাইনস ব্যবসায় লাভজনক অবস্থা এখনো অর্জন হয়নি।
অভ্যন্তরীণ মতের অভাব
বিমানের জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির বিষয়ে কিছুই জানে না। সাবেক বোর্ড সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “বিমানের ফ্লিট প্ল্যানিং কমিটি বা বোর্ডকে বাদ দিয়ে এমন বিশাল সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া কৌশলগতভাবে ভুল।”
সারসংক্ষেপ:
| বিষয়ের নাম | বিস্তারিত |
|---|---|
| মোট কেনা হবে | ২৫টি উড়োজাহাজ |
| খরচ | আনুমানিক ৫০ হাজার কোটি টাকা |
| বিমান মডেল | ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার (১০টি), ৭৩৭ ম্যাক্স (১৫টি) |
| অর্থায়ন | বিদেশি ঋণ, এক্সিম ব্যাংক ইউএসএ, সরকারি ভর্তুকি |
| বর্তমান বহর | ২১টি উড়োজাহাজ |
| বছরে অতিরিক্ত ফ্লাইট প্রয়োজন | ৪০০–৫০০ |
| চ্যালেঞ্জ | রুট সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পাইলট ও মেইনটেন্যান্স সংকট |
এই পরিকল্পনা সফল হলে বাংলাদেশের আকাশপথে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা। না হলে বিশাল এই বহর হয়ে উঠতে পারে শুধু এক বোঝা—ধুলায় ঢাকা হ্যাঙ্গারে, নীরবে বসে থাকা কোটি কোটি টাকার উড়ন্ত স্বপ্ন!



