
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের পোড়াদহ এলাকায় ইছামতী নদীর তীরে প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বুধবার বসে এক অসাধারণ লোকজ উৎসব। এটি শুধু একটি মেলা নয়, বরং প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পারিবারিক বন্ধন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক অপূর্ব সমন্বয়। শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পোড়াদহ মেলা ‘জামাই মেলা’ নামেও সুপরিচিত। বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে নির্ধারিত এই দিনে মেলায় অন্তত ১০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়, যার মধ্যে কয়েক কোটি টাকাই শুধু মাছ বিক্রির মাধ্যমে। একদিনের এই মেলার রেশ থাকে সপ্তাহজুড়ে। পরদিন সকালে একই চত্বরে বসে ‘বউ মেলা’, যেখানে নারীদের জন্য নির্ধারিত এক অনন্য বাজার গড়ে ওঠে।
পোড়াদহ মেলার ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো। স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, সঠিক সাল-তারিখ নির্ধারণ করা কঠিন হলেও এই মেলা অন্তত চার শতাব্দী ধরে চলে আসছে। কথিত আছে, প্রায় ৪০০ বছর আগে পোড়াদহ সংলগ্ন মরা বাঙ্গালী নদীতে মাঘের শেষ বুধবার অলৌকিকভাবে একটি বড় কাতলা মাছ সোনার চালুনি পিঠে নিয়ে ভেসে উঠতো। এই অলৌকিক দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ জড়ো হতেন। পরে স্থানীয় এক সন্ন্যাসী স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এই মাছের উদ্দেশে অর্ঘ্য নিবেদনের আহ্বান জানান। তাঁর উদ্যোগে পোড়াদহ বটতলায় সন্ন্যাসীপূজা শুরু হয়। এই পূজা ঘিরেই গড়ে ওঠে মেলা। ইছামতীর তীরে এখনও সন্ন্যাসীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। কালক্রমে এটি সন্ন্যাসী মেলা থেকে পোড়াদহ মেলায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে মেলা ঘিরে আশপাশের গ্রামগুলোতে মেয়ে, জামাই, নাতি-নাতনি ও স্বজনদের দাওয়াত দেওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়। এভাবেই এটি ‘জামাই মেলা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। জামাইরা মেলা থেকে বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যান, সেখানে মাছ রান্না করে আত্মীয়-স্বজনদের আপ্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি নানা পিঠা বানিয়ে খাওয়ানো হয়। গাবতলী, সারিয়াকান্দি, ধুনটসহ আশপাশের অঞ্চলে এই রীতি এখনও অটুট।
মেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো বিশালাকার মাছের বেচাকেনা। ইছামতী, করতোয়া, যমুনা ও বাঙ্গালী নদী থেকে ধরা আসে নানা প্রজাতির মাছ। বাগাড়, রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, সিলভারকার্প, বিগহেড, গ্রাসকার্প, পাঙাশ, আইড়, কালিবাউশ ও চিতল মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। ভোর থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মেলা চত্বর সরগরম হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় বাগাড় ও আইড় মাছ। আগে দেড় থেকে আড়াই মণ ওজনের বাগাড় মাছ পাওয়া যেতো। তবে ২০২২ সালে সরকারি নিষেধাজ্ঞায় ‘মহাবিপন্ন’ প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় বাগাড় মাছ এখন প্রকাশ্যে বিক্রি হয় না। তারপরও ১৫ থেকে ২৫ কেজি ওজনের মাছগুলো ক্রেতাদের আকর্ষণ করে। এ কারণে অনেকে এই মেলাকে ‘মাছের মেলা’ও বলে থাকেন।
মেলায় মাছের পাশাপাশি মিষ্টান্নের অপূর্ব সমাহার চোখে পড়ে। দোকানিরা সারি সারি মাছ আকৃতির মিষ্টি সাজিয়ে রাখেন। এক কেজি থেকে শুরু করে ১২ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন সাইজের এই মিষ্টি জামাইদের বিশেষ পছন্দের। বাদশা ভোগ, সাজ বাদশা, কমলা ভোগ, কালোজাম, চমচম, কাটি মিষ্টি, ফলমন, ক্ষিরমন, রসগোল্লা, দুধ কলা, লাড্ডু, জিলাপি, ছানার জিলাপি, সন্দেশ, নিমকি, খই, মুড়ি, পানি তাওয়া, তিলের ও নারকেলের নাড়ুসহ হরেক রকম মিষ্টি থালাভরে কিনে নিয়ে যান দর্শনার্থীরা। এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানও বসে। চাকু, বঁটি, কুড়াল, দা, মশলা, কাঠের আসবাব, স্টিল ও লোহার তৈরি বিভিন্ন আসবাবপত্র কেনাকেনা হয়। কসমেটিকস, খেলনা, গিফট আইটেমের দোকানগুলোতে নারী ও শিশুদের ভিড় লেগেই থাকে।
মেলার পরদিন বসে বউ মেলা। এটি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে। পশ্চিম মহিষাবান ত্রিমোহিনী এলাকায় এই মেলায় শুধু নারীরাই ক্রেতা-দর্শনার্থী হিসেবে অংশ নেন। দোকানদার ছাড়া পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। রেশমি চুড়ি, আলতা, চিরুনি, হাঁড়ি-পাতিল, খুন্তি-কড়াই, পানের বাটা, খেলনা, মিষ্টান্নসহ নানা পণ্যের পসরা সাজানো হয়। নারীদের এই স্বাচ্ছন্দ্যময় কেনাকাটার সুযোগই এই মেলার নামকরণ করেছে ‘বউ মেলা’। এখানে নারীদের ঢল নামে, শিশুরা থাকলেও নারীদের উপস্থিতিই সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো।
মেলায় বিনোদনেরও কমতি নেই। চরকি, নাগরদোলা, মৃত্যুকূপে মোটরসাইকেল খেলা, সার্কাস, যাত্রাপালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। অস্থায়ী হোটেল, ফুচকা, চটপটি, ভাজাপোড়া, আচার ও আইসক্রিমের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকে। মেলা ঘিরে আশপাশের শতাধিক গ্রামে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। কাজের ব্যস্ততায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনরা এই মেলায় একত্রিত হন। সব ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও মতের মানুষের মিলনকেন্দ্র হয়ে ওঠে এই মেলা।
মেলা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে গাবতলীর মহিষাবান গ্রামের মন্ডল পরিবার। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবার মেলাটি আয়োজন করে আসছে। বর্তমান আয়োজক কমিটির সভাপতি ও মহিষাবান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ মন্ডল বলেন, ‘পোড়াদহ বা সন্ন্যাসী মেলা কবে শুরু হয়েছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে অন্তত ৪০০ বছর ধরে চলছে। বাপ-দাদার কাছ থেকে আমরা এমনটি শুনে আসছি।’ তাঁর নেতৃত্বে মেলাটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় এবং প্রতি বছরই নতুন নতুন আকর্ষণ যোগ হয়।
পোড়াদহ মেলা শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, বরং বাংলার লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত উদাহরণ। এই মেলা আধুনিক যুগেও প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। জামাই-বউ মেলার মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্ক নতুন করে বাঁধা হয়, সামাজিক বন্ধন মজবুত হয় এবং স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। ইছামতী নদীর তীরে প্রতি বছর এই মেলা বসলে চারপাশে উৎসবের হাওয়া বয়। দর্শনার্থীদের কাছে এটি শুধু কেনাকাটা বা বিনোদনের স্থান নয়, বরং স্মৃতি জাগানিয়া এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব। বগুড়ার এই লোকজ মেলা বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির গৌরবময় অংশ হয়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়।
প্রতিবেদক : ইসলাম রাইসুল



