পাহাড়, সমুদ্র আর চা–বাগানের অনন্য মিলন—বাঁশখালী হয়ে উঠছে নতুন পর্যটন গন্তব্য

ছবি: সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : চা–পাতায় ভরা সবুজ উপত্যকা, পাহাড়ের কোলঘেঁষা ঝাউবন আর অদূরে নীলচে সমুদ্রের ঢেউ—সব মিলিয়ে যেন এক ছবির ফ্রেম। এমন অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেখা মেলে চট্টগ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের উপজেলা বাঁশখালীতে। পাহাড়, সমুদ্র ও চা–বাগান—এই তিন বৈচিত্র্যের মিলন ঘটেছে এক জায়গায়।

চট্টগ্রাম শহর থেকে তৈলারদ্বীপ সেতু পার হলেই বাঁশখালী উপজেলা। প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছে এই সবুজ ও নীলের মিলন দেখতে। কক্সবাজারের পথে যাঁরা যান, তাঁদের অনেকেই এখন পথে একটু সময় নিয়ে বাঁশখালী ঘুরে দেখেন।

চা–বাগানের মায়া

তৈলারদ্বীপ সেতু পার হয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ পেরুলেই চোখে পড়ে চাঁনপুর বাজার। সেখান থেকে রামপুর ডিসি সড়ক ধরে পুকুরিয়া চৌমুহনী পৌঁছালে দেখা মেলে বিখ্যাত বেলগাঁও চা–বাগানের। এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের একমাত্র চা–বাগান, এবং সারাবছরই দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

চা–বাগানের প্রবেশপথে ছোট পার্কিং এলাকা রয়েছে, যেখানে পর্যটকরা যানবাহন রেখে নিরিবিলি পরিবেশে ঢুকতে পারেন। ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, শ্রমিকরা চা–পাতা তুলছেন, কেউ প্রক্রিয়াজাত করছেন, কেউবা বিশ্রামে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। পাশে পুরনো বাংলো, ছায়াঘেরা পথ, সব মিলিয়ে এক শান্ত ও নান্দনিক পরিবেশ।

বেলগাঁও চা–বাগানটি ১৯৮৫ সালে ৬৪০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখন এর আয়তন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩৩ একর। ২০২৫ সালে বাগানটির লক্ষ্য চার লাখ কেজি চা–পাতা উৎপাদন

চা–বাগানের ব্যবস্থাপক মো. সেলিম উদ্দিন জানালেন, “প্রতিদিনই এখানে নতুন মানুষ আসে। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। শান্ত পরিবেশ আর ছবির মতো দৃশ্য তাদের মুগ্ধ করে।”

চট্টগ্রাম শহর থেকে আসা ভ্রমণপ্রেমী নাফিসা রহমান বললেন, “আমি ঢাকায় থেকেও এমন চা–বাগান দেখিনি। এখানকার বাতাসে একটা অন্যরকম প্রশান্তি আছে। পাহাড়ের পাশে চা–বাগান, এমন দৃশ্য বাংলাদেশে বিরল।”

সৈকতের বিস্ময়

চা–বাগানের পর বাঁশখালীর আরেক আকর্ষণ—তার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত। বালিয়াড়ি, বেড়িবাঁধ আর ঝাউবনে ঘেরা এই সৈকত কক্সবাজারের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম। ৩৭ কিলোমিটারজুড়ে সৈকতটি বিস্তৃত—খানখানাবাদ থেকে বাহারছড়া, ছনুয়া, গণ্ডামারা, সরল ইউনিয়ন পর্যন্ত।

এই বিশাল সৈকত তিনটি ভিন্ন নামে পরিচিত—কদমরসুল সৈকত, খানখানাবাদ সৈকত, এবং বাহারছড়া সৈকত

কদমরসুল সৈকতকে বলা হয় সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন। গুনাগরী খাসমহল থেকে পশ্চিমে সাত কিলোমিটার দূরে এটি অবস্থিত। বিকেলের সূর্যাস্তে ঝাউবনের ফাঁক দিয়ে আলো এসে বালিতে পড়লে দৃশ্যটা যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো লাগে। এখানে লাল কাঁকড়া দেখা যায় প্রচুর।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর সৈকতের বালিয়াড়িতে ঝাউগাছ লাগানো শুরু হয়। এর পর থেকেই পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকে। একসময় পর্যটন করপোরেশন এখানে কংক্রিটের ছাতা, বৈঠকখানা ও একটি রিসোর্ট নির্মাণ করেছিল। যদিও রিসোর্টটি বর্তমানে বন্ধ, তবু সৈকতের পাশে বসে সূর্যাস্ত দেখা এখনো দর্শনার্থীদের প্রিয় অভ্যাস।

অল্প দক্ষিণে, মাত্র আধা কিলোমিটার দূরেই খানখানাবাদ সৈকত। বেড়িবাঁধ বরাবর সারি সারি দোলনা, কংক্রিটের সিসি ব্লক—সবকিছু মিলে এটি স্থানীয়দের বিকেলের আড্ডাস্থল। অনেকেই এখানে বসে সাগরের দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটান।

আর সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশটি হলো বাহারছড়া সৈকত। বাঁশখালীর কালীপুর ইউনিয়নের সালেহার বাপের পুল থেকে পশ্চিমে বশিরুল্লাহ বাজার হয়ে গেলে পাওয়া যায় এই সৈকত। বেড়িবাঁধে স্থানীয় দোকানিরা চেয়ারে–টেবিলে বসার ব্যবস্থা করেছেন, রোদ এড়াতে বড় ছাতা রেখেছেন। চা, ফুচকা, ভাজাপোড়া—সব মিলে বিকেলের প্রাণবন্ত জায়গা এটি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী কামরুল হাসান বললেন, “এখানে প্রতিদিন বিকেল হলে মানুষ ভিড় জমায়। বেড়িবাঁধে বসে সূর্যাস্ত দেখা এখন অনেকের রুটিন। আমরা চাই পর্যটন করপোরেশন আবার উদ্যোগ নিক, তাহলে বাঁশখালী আরও পরিচিত হবে।”

পাহাড়ের আহ্বান

বাঁশখালীর পূর্ব অংশজুড়ে রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল। পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালীপুর, বৈলছড়ি, জলদি, শীলকূপ, চাম্বল ও পুইছড়ি—এই আট ইউনিয়ন পাহাড়ে ঘেরা। এর মধ্যে কালীপুর ইউনিয়নের পাহাড় সবচেয়ে উঁচু, সেখান থেকে নিচে তাকালে শঙ্খ নদ আর গণ্ডামারা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দৃশ্য চোখে পড়ে।

সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে চাম্বল ইউনিয়নের ‘মিনি কাশ্মীর’। প্রধান সড়ক থেকে তিন কিলোমিটার ভেতরে এই জায়গায় রয়েছে আম্বাঘোনা, ছিবাজিল্লা ঝিরি, গৌরাণিতা ঝিরি, ও বন্বিতা ঝিরি—চারটি পাহাড়ি ঝিরিপথ। বর্ষায় এখানে ঝিরির জলধারা ছুটে আসে পাহাড় বেয়ে, চারপাশে কুয়াশা আর সবুজের ঘন জঙ্গল।

চট্টগ্রাম শহর থেকে রিকশায় উত্তর চাম্বল হয়ে সিকদার দোকান পর্যন্ত যাওয়া যায়। সেখান থেকে প্রায় বিশ মিনিট হাঁটলেই ‘মিনি কাশ্মীর’। শীতের সকালে এখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখা এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

এ ছাড়া রয়েছে বাঁশখালী ইকোপার্ক—শীলকূপ ইউনিয়নে ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পার্ক এখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র। প্রায় এক হাজার হেক্টর পাহাড়ি এলাকা নিয়ে তৈরি এ পার্কে রয়েছে স্বচ্ছ লেক, পাখির কলতান, ঘন বন, আর প্রায় ৩১০ প্রজাতির উদ্ভিদ। মনসুরিয়া বাজার থেকে পার্কে যাওয়া যায় সহজেই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আবদুল কাইয়ুম বললেন, “ভৌগোলিকভাবে বাঁশখালী অসাধারণ। এখানে পাহাড়, নদী, সমুদ্র, চা–বাগান—সব আছে। শুধু সরকারি মনোযোগ আর পরিকল্পনা দরকার। সেটা পেলে বাঁশখালী হবে দেশের পরবর্তী পর্যটন স্বর্গ।”

কীভাবে যাবেন

চট্টগ্রাম শহর থেকে বাঁশখালী যেতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। দামপাড়া বা বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি বাস বা মাইক্রো পাওয়া যায়। তৈলারদ্বীপ সেতু পার হলেই উপজেলা শুরু।

স্থানীয় পর্যটকরা সাধারণত একদিনেই চা–বাগান, সৈকত আর পাহাড় তিনটিই ঘুরে নেন। তবে যারা রাত কাটাতে চান, তাঁদের জন্য চাঁনপুর ও বাহারছড়া এলাকায় কয়েকটি ছোট গেস্টহাউস ও হোমস্টে রয়েছে। ভাড়া জনপ্রতি ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা

খাবারের জন্য সৈকতপাড়েই ছোট দোকানগুলোতে পাওয়া যায় ভাজা মাছ, ভাত, ডাবের পানি ও স্থানীয় সি–ফুড।

কেন বাঁশখালী?

বাঁশখালীর বিশেষত্ব হলো এর বৈচিত্র্য। একদিকে চা–বাগানের নীরবতা, অন্যদিকে সমুদ্রের গর্জন। এর সঙ্গে পাহাড়, ঝিরি, বন—সব মিলে এটি এক জীবন্ত প্রাকৃতিক প্রদর্শনী।

যদি কেউ একদিনে পাহাড়, সমুদ্র ও চা–বাগান দেখতে চান, তাহলে বাঁশখালী তার নিখুঁত ঠিকানা।

এখন পর্যটন করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসন যদি কিছু বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা নেয়—যেমন রাস্তা উন্নয়ন, বিশ্রামাগার, তথ্যকেন্দ্র, এবং গাইড সার্ভিস—তাহলে বাঁশখালী হয়ে উঠবে বাংলাদেশের নতুন পর্যটন রাজ্য।ছবি

Read Previous

দেশের পর্যটনে অবদান রাখায় ১৩ জনকে সম্মাননা, জমকালো আয়োজনে শুরু হলো ১৩তম বিটিটিএফ ২০২৫

Read Next

সিলেটের রেলপথ সংস্কারসহ আট দফা দাবিতে অবরোধ, দুর্ভোগে সাধারণ যাত্রীরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular