
গণভোটের দাবিতে উত্তাল নয়াপল্টন
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : রাজধানীর পল্টন আজ পরিণত হয়েছে জনতার ঢল আর স্লোগানে মুখর এক রাজপথে। “গণভোট গণভোট—জনগণের ভোট” ধ্বনিতে প্রকম্পিত এলাকা জুড়ে অবস্থান নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। তাদের দাবি—নভেম্বরের মধ্যেই জাতীয় গণভোটের তারিখ ঘোষণা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনী সংস্কার বাস্তবায়ন।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে দলীয় পতাকা ও ফেস্টুন হাতে নেতা-কর্মীরা পল্টনে জড়ো হতে শুরু করেন। বেলা সোয়া ১১টার দিকে মূল সমাবেশে মঞ্চে আসেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য হাফেজ ইউনুস আলী, জাগপার সভাপতি তানিয়া রবসহ অন্যান্য নেতারা। সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে তারা যমুনা ভবনে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে যৌথ স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
পল্টনের মঞ্চে বক্তব্য দিতে গিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “দেশের জনগণ আজ গণভোট চায়। আমরা কাউকে হটাতে চাই না, কিন্তু জনগণের মতামত ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা হতে পারে না।” তার দাবি, গণভোটই পারে দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসন করতে।
আট দলের পাঁচ দফা দাবি
এই যৌথ আন্দোলনের পেছনে রয়েছে একটি স্পষ্ট পাঁচ দফা দাবি। প্রথমত, নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, নির্বাচন ব্যবস্থায় সব দলের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রমে প্রশাসনিক বাধা অপসারণ করতে হবে। আর পঞ্চমত, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছাকে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
এই দাবিগুলোর পক্ষে জামায়াত ছাড়াও মাঠে নেমেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)।
বিক্ষোভে জনস্রোত ও নিরাপত্তা
পল্টনের চারপাশে সকাল থেকেই পুলিশের টহল বাড়ানো হয়। ভোর থেকেই ট্রাফিক বিভাগ বিকল্প রুটে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। তবু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে লোকজন এসে যোগ দেয় বিক্ষোভে। ঢাকা দক্ষিণের বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড এবং ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা ব্যানার হাতে নেমে আসে রাজপথে।
সমাবেশে ইসলামী আন্দোলনের এক নেতা বলেন, “গণভোট মানে ভয় নয়, এটি জনগণের সিদ্ধান্ত জানানোর শান্তিপূর্ণ উপায়।” তার দাবি, “রাজনৈতিক সমঝোতার পথ গণভোটের মাধ্যমেই খুলে যাবে।”
পল্টনে জড়ো হওয়া কর্মীদের হাতে দেখা যায় নানা ব্যানার ও পোস্টার—“গণভোট ছাড়া গণতন্ত্র নয়”, “জনগণের সিদ্ধান্তে রাষ্ট্র চলুক”, “রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধ করো”—এসব স্লোগানেই মুখর হয় এলাকা।
পটভূমি ও সরকারের অবস্থান
ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি তোলে জামায়াতে ইসলামী। সে সময় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, নির্বাচনের আগে জনগণের মতামত যাচাই করতে হবে। গত বুধবার তিনি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে গণভোটের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বলেন, “গণতন্ত্রে জনগণই শেষ কথা। গণভোট ছাড়া সেই কথা শোনা সম্ভব নয়।”
সরকারি সূত্র জানায়, গণভোট আয়োজন নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সংলাপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “যে কোনো দল যদি লিখিতভাবে প্রস্তাব দেয়, তা বিবেচনা করা হবে।”
কী হতে পারে পরবর্তী ধাপ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আট দলের যৌথ পদক্ষেপ মূলত সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল। অনেকেই মনে করেন, গণভোটের দাবি আপাতত প্রতীকী হলেও এটি নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে নির্দেশনা পেয়েছে।
বিকেল নাগাদ সমাবেশ শেষ হওয়ার পর মিছিল সহকারে নেতারা যমুনা ভবনের দিকে যাত্রা করেন স্মারকলিপি হস্তান্তরের জন্য। তাদের হাতে ছিল সেই পাঁচ দফা দাবির কপি—যেখানে লেখা ছিল, “গণভোটই জনগণের কণ্ঠস্বর, সেটিই হতে হবে জাতির পথনির্দেশ।”
এই বিক্ষোভে স্পষ্ট হয়েছে এক বাস্তবতা—দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে আবারও জনগণের মতামত, গণভোট এবং নির্বাচনী সংস্কারই হয়ে উঠছে কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয়। আর এই দাবিকে সামনে রেখে বিরোধী দলগুলো যে নভেম্বরকে উত্তপ্ত করে তুলতে চায়, তার ইঙ্গিত মিলেছে আজকের পল্টনের জনসমুদ্রে।



