১৯/০৪/২০২৬
৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবের হজ পরিবহন পরিকল্পনা: ৩১ লাখ আসন ও ১২ হাজার ফ্লাইটে লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রীর নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত

পবিত্র হজ

ফাইল ছবি

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : সৌদি আরব সরকার ১৪৪৭ হিজরি সালের হজ মৌসুমকে সামনে রেখে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সমাবেশে অংশগ্রহণকারী লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রীর জন্য এক বিস্তৃত ও সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা প্রস্তুত করেছে। এই পরিকল্পনায় আকাশপথ, রেলপথ, সড়কপথ এবং সমুদ্রপথ—সব মাধ্যমকেই সর্বোচ্চ স্তরের প্রস্তুতিতে নিয়ে আসা হয়েছে। পরিবহন ও রসদ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গৃহীত এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি তীর্থযাত্রী যাতে নিরাপদ, আরামদায়ক ও নির্বিঘ্নভাবে পবিত্র হজ পালন করতে পারেন।

বিমান চলাচল খাতে সৌদি কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি নিয়েছে। এবারের হজ মৌসুমে তীর্থযাত্রীদের জন্য মোট ৩১ লাখেরও বেশি আসন বরাদ্দ করা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক আসন ১২,০০০-এর অধিক নির্ধারিত ও চার্টার ফ্লাইটের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ছয়টি প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে হজ ফ্লাইট গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে মনোনীত করা হয়েছে। এসব বিমানবন্দরে ২২,০০০-এরও বেশি প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।

নতুন করে চালু করা হয়েছে ‘ব্যাগেজ-ফ্রি ট্র্যাভেলার’ সেবা, যার মাধ্যমে তীর্থযাত্রীরা তাদের বাসস্থান থেকে সরাসরি লাগেজ পাঠিয়ে দিতে পারবেন। এছাড়া জমজম পানির অগ্রিম চালান ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। জাতীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়া ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় ১০ লাখেরও বেশি আসন সরবরাহ করবে। অন্যদিকে ফ্লাইনাস ২০টি আন্তর্জাতিক গন্তব্য থেকে ১ লাখ ৪৭ হাজারেরও বেশি তীর্থযাত্রী পরিবহনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দরগুলো যেন তাদের সেবার মান অক্ষুণ্ণ রাখে, সেজন্য বিশেষ নিয়ন্ত্রক দল মোতায়েন করা হয়েছে।

রেলপথে তীর্থযাত্রীদের যাতায়াতকে আরও সহজ ও দ্রুত করতে সৌদি আরব রেলওয়ে ‘মাশাইর’ ট্রেন সার্ভিসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এই ট্রেনটি মিনা, মুজদালিফা ও আরাফাতের মধ্যে ২,০০০-এরও বেশি ট্রিপ পরিচালনা করবে এবং বিশ লক্ষেরও বেশি যাত্রী বহন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি হারামাইন দ্রুতগতির রেলপথ কিং আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মক্কা ও মদিনাকে সংযুক্ত করে ৫,৩০৮টি ট্রিপের মাধ্যমে ২২ লাখেরও বেশি আসন সরবরাহ করবে। এই আধুনিক রেল ব্যবস্থা তীর্থযাত্রীদের পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে দ্রুত ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে।

সড়কপথেও নিরাপত্তা ও সুবিধা বাড়াতে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সড়কগুলোতে ব্যাপক রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চালানো হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৫ কোটি ৬০ লক্ষ ঘনমিটারেরও বেশি বালির টিলা পরিষ্কার করা হয়েছে। ১ লাখ ৭৮ হাজার আলোকসজ্জা ইউনিটের রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে এবং ৪ হাজারেরও বেশি দিকনির্দেশক ও সতর্কীকরণ চিহ্ন স্থাপন করা হয়েছে। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ৩৩,০০০-এর বেশি বাস ও ৫,০০০ ট্যাক্সির একটি বিশাল বহর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শন বাড়িয়ে নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে মেনে চলা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

লজিস্টিকস ও ডাক সেবা খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সৌদি পোস্ট বিমানবন্দর, হাসপাতালসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত সেবা পৌঁছে দিতে ট্রাক, ডেলিভারি গাড়ি, ইলেকট্রিক স্কুটার ও মোটরবাইকের বিশাল বহর মোতায়েন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ তীর্থযাত্রীদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী দ্রুত সরবরাহে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

সমুদ্রপথেও প্রস্তুতি কম নয়। জেদ্দা ইসলামিক বন্দরকে তীর্থযাত্রীদের গ্রহণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করা হয়েছে। বন্দরের সুবিধাদি আধুনিকায়ন করা হয়েছে এবং যাত্রীদের আগমন প্রক্রিয়া সুবিন্যস্ত করতে বিশেষ দল নিয়োগ করা হয়েছে। এতে করে সমুদ্রপথে আসা তীর্থযাত্রীরাও সহজেই পবিত্র ভূমিতে পৌঁছাতে পারবেন।

নিরাপত্তার দিক থেকে সৌদি আরব অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা কেন্দ্র জানিয়েছে, যেকোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনার মোকাবিলায় জরুরি ও প্রতিক্রিয়া দলগুলো সকল পরিবহন খাতে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবে। এই বিস্তৃত প্রস্তুতি শুধু যাতায়াত নয়, বরং তীর্থযাত্রীদের সার্বিক অভিজ্ঞতাকে আরও স্মরণীয় ও নিরাপদ করে তুলবে।

সৌদি আরবের এই বিপুলায়তন পরিবহন পরিকল্পনা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মুসলিম তীর্থযাত্রীদের জন্য একটি স্বাগত বার্তা। প্রতি বছর হজ মৌসুমে কয়েক মিলিয়ন মানুষ একত্রিত হয়ে পবিত্র কাবা শরীফ ও অন্যান্য পবিত্র স্থানে ইবাদত করেন। এমন একটি বিশাল সমাবেশ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা যেকোনো দেশের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সৌদি আরব এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে একটি মডেল তৈরি করছে।

এই পরিকল্পনা শুধু হজ মৌসুমের জন্য নয়, ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের ধর্মীয় ও আন্তর্জাতিক সমাবেশ পরিচালনায় সৌদি আরবের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে। তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও আরাম নিশ্চিত করতে সরকারের এই সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

সূত্র: গালফ নিউজ

Read Previous

বাংলাদেশি পর্যটকদের ভিসা পেতে বাধা কেন: বাস্তবতা, ভুল ধারণা ও উত্তরণের পথ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular