
নিজস্ব প্রতিবেদক, পর্যটন সংবাদ: ঢাকা থেকে ভ্রমণপিয়াসু কয়েকজনের ছোট্ট একটি দল সম্প্রতি ঘুরে এল কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওরে। ‘ব্রেকফাস্ট আড্ডা’ নামে পরিচিত এই দলটি নিয়মিত বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়, আড্ডা দেয়, খায়-দায় এবং নানা অঙ্গনের মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করে। এ রকম এক সফরে তাঁরা পৌঁছান নিকলী হাওরের গা ঘেঁষা অঞ্চলে। সফরের শুরুতেই প্রথম দিন তাঁরা ছিলেন কটিয়াদীর জালালপুর ইকো রিসোর্টে।
হাওরের পথে বৃষ্টিময় সকাল
পরের দিন সকালে বৃষ্টি দিয়েই দিনটা শুরু হয়। অনেকেই তখন দ্বিধায়—এই আবহাওয়ায় হাওরে যাওয়া হবে কি না। কেউ কেউ রিসোর্টেই কাটিয়ে দিতে চাইলেন দিনটা। তবে হাওরে যাওয়ার পক্ষেই ছিলেন লেখক ও ভ্রমণসঙ্গী মাহমুদ হাফিজসহ কয়েকজন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বৃষ্টি থাকলেও হাওরেই যাওয়া হবে।
কিশোরগঞ্জের পথে পিচঢালা সড়ক
কটিয়াদী থেকে পুলের ঘাট পেরিয়ে সরু একটি সড়কে এগিয়ে চলেন তাঁরা। বনগ্রাম বাজারের হাটে চোখে পড়ে হাওরের মাছভর্তি সরগরম বাজার। এরপরই একসময় দেখা মেলে জলের বিশাল রাজত্বের—নিকলী হাওর ধরা দেয় চোখে। বেড়িবাঁধের ওপর গিয়ে দাঁড়াতেই সামনে উদ্ভাসিত জলসমুদ্র।
নৌকাভ্রমণে হাওরের বিশালতা
বাঁধঘাটে তখন বাঁধা ১৪–১৫টি নৌকা, যাত্রার জন্য বেছে নেওয়া হয় নীল রঙের একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। ছাদে চড়ে বসে তাঁরা রওনা দেন হাওরের ভেতর। নৌকা যতই এগোয়, ততই সামনে মেলে ধরে হাওরের বিশাল জলরাশি। কেউ কেউ ভুল করে ভাবেন, এখানেই হাওরের শেষ দেখা যাচ্ছে। অথচ এই বিস্তীর্ণ জলরাশির কোনও কেন্দ্র নেই, নেই কোনও সীমানা। জল আর আকাশ মিলে তৈরি করেছে এক অনন্য নান্দনিক অনুভূতি।
মাঝপথে গুগল ম্যাপ ঘেঁটে জানা যায়, এই হাওরের তলদেশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঘোড়াউত্রা নদী। নদীর ঢেউয়ের মতোই হাওরের পানিতে দুলে ওঠে নৌকা।
ছাতিয়ার চর, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা
দূরে দেখা যায় একটি দ্বীপ—ছাতিয়ার চর। গুগল ম্যাপে এই এলাকা অনেক সময় ‘নিকলীছাতিয়া’ নামে দেখা যায়। সেখানে যেতে চাইলেও মাঝিরা নিরুৎসাহ করে সময়ের দোহাই দিয়ে। তাই সে গন্তব্য এবার বাদ পড়েই যায়। নৌকা এগিয়ে চলে মিঠামইনের দিকে, যেখানে বর্ষায় কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চল রূপ নেয় হাওরের জলে।
স্নিগ্ধতায় মোড়ানো হাওরের দিন
ভ্রমণদলের সদস্যরা কখনো নিজেদের ছবি তোলেন, কখনো হাওরের। কেউ কেউ ছইয়ের নিচে ঢুকে স্মার্টফোনের পর্দায় চোখ রাখেন। বাইরে আলো এতই উজ্জ্বল যে স্ক্রিন কিছুই দেখা যায় না, যদিও আকাশে সূর্য ততটা তেজদীপ্ত নয়। প্রাতঃকালীন বৃষ্টির পর প্রকৃতি হয়ে উঠেছে স্নিগ্ধ, নরম আলোয় মোড়ানো।
চারপাশে বাতাস বইছে হাওরের জলের শীতলতা নিয়ে। দিগন্তে হালকা নীলাভ আকাশ, আর তাতে সাদা মেঘের সুশৃঙ্খল সমাবেশ। সূর্য দীর্ঘ সময় আড়ালে থেকে যেন আলোকে আরও কোমল করে তুলেছে। নিকলী হাওর জুড়ে তখন এক অপূর্ব শান্তি আর প্রশান্তির পরিবেশ।
ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য বার্তা
নিকলী হাওর শুধু একটি পর্যটন গন্তব্য নয়, বরং এটি একটি অনুভবের জায়গা। যেখানে জল, আকাশ আর বাতাস মিলে এক অপূর্ব রূপের সৃষ্টি করে। যারা প্রকৃতির বিশালতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চান, তাঁদের জন্য নিকলী হাওর হতে পারে অনন্য এক গন্তব্য।



