
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার মাধনগরের ছোট্ট গ্রাম হাজীপাড়ার একটি নাম এখন পরিবেশ রক্ষায় সারা দেশের কাছে অনুপ্রেরণা—ফজলে রাব্বী। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাঁর অবদানে শুধু প্রাণ পেয়েছে হাজারো বন্য প্রাণী নয়, বরং পর্যটন সম্ভাবনাময় এই অঞ্চল হয়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব ভ্রমণকারীদের কাছে আকর্ষণীয় এক গন্তব্য।
২০২০ সালের ১২ আগস্ট, নলডাঙ্গার এক গ্রামে একসঙ্গে ৪৯টি বিষধর পদ্মগোখরা সাপ আটকে রাখার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি জানতে পেরে ফজলে রাব্বী দ্রুত যোগাযোগ করেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এবং উদ্ধার করা হয় সবগুলো সাপ। এই একটি ঘটনাই নয়—শিকারিদের ফাঁদ থেকে তিনি উদ্ধার করেছেন ৯ হাজারের বেশি পাখি, ৮২টি সাপ, ১৮টি বনবিড়াল, ২৮টি কাছিমসহ নানা প্রজাতির প্রাণী। এমনকি ৩৫০টি ফাঁদ ও জালও ধ্বংস করেছেন তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরিতে ফজলে রাব্বী গড়ে তুলেছেন ‘সবুজ বাংলা’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এই সংগঠনের সদস্যরা স্থানীয় শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ। হালতি বিল, বনভূমি কিংবা গ্রামীণ জলাভূমিতে বন্য প্রাণী বিপদে পড়লেই খবর যায় রাব্বীর কাছে, তিনি ছুটে যান ঘটনাস্থলে।
পর্যটকদের কাছে নলডাঙ্গা এখন শুধু একটি গ্রাম নয়—একটি ‘সবুজ দর্শনীয় স্থান’। বাশভাগ, মাধনগর, হাজীপাড়া ঘুরলে চোখে পড়ে সুনিপুণভাবে রোপণ করা হাজার হাজার গাছ। রাস্তার ধারে সারি সারি বকুলগাছ, মাদ্রাসার আঙিনায় আম-কাঁঠাল—সবই ফজলে রাব্বীর উদ্যোগে লাগানো। প্রায় এক যুগ আগে রোপিত এসব গাছে এখন ফুল ও ফল ধরেছে, আশ্রয় পেয়েছে নানা পাখি।

‘সবুজ বাংলার’ বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক হুমাউন রশিদ বলেন, “রাব্বীর কাজ দেখে অনেকে গাছ লাগানো শুরু করেছেন। এখন আমাদের গ্রামও পর্যটকদের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও শান্ত পরিবেশ তৈরি করছে।”
ফজলে রাব্বীর নিরলস কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৫ সালের বন্য প্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার তুলে দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের (বিবিসিএফ) প্রচার সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন রাব্বী। তিনি বলেন, “নলডাঙ্গা পুরোপুরি বন্য প্রাণীর জন্য নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত আমার কাজ থামবে না।” তাঁর স্বপ্ন, নলডাঙ্গাকে একটি পরিবেশবান্ধব পর্যটন অঞ্চলে পরিণত করা, যেখানে মানুষ প্রকৃতি ও প্রাণীর সঙ্গে মেলবন্ধনে বেড়াতে আসবে।
রাজশাহী বিভাগের বন সংরক্ষক ও বিবিসিএফের প্রতিষ্ঠাতা মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, “এই তরুণদের জন্যই আজও অনেক প্রাণী টিকে আছে। তারা একা হাতে যা করছে, তা প্রকৃত অর্থেই জাতীয় সম্পদ রক্ষার কাজ।”
পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে ফজলে রাব্বীর মতো মানুষ—যাঁরা শুধু প্রকৃতিকে ভালোবাসেন না, বরং তা রক্ষা করতেও জীবন উৎসর্গ করেন। নলডাঙ্গা আজ শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের নয়, সচেতন পর্যটকদের জন্যও একটি আদর্শ গন্তব্য।



