১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

থু বন নদীর তীরে ৫০০ বছরের ঐতিহ্য: থান হা মৃৎশিল্প গ্রাম হয়ে উঠছে ভিয়েতনামের কমিউনিটি পর্যটনের উজ্জ্বল উদাহরণ

থান হা মৃতশিল্পের গ্রাম

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ভিয়েতনামের পর্যটন মানচিত্রে ধীরে কিন্তু স্থিরভাবে নিজের অবস্থান শক্ত করছে থান হা মৃৎশিল্প গ্রাম। ২০২৫ সালের শেষের দিকে এসে থু বন নদীর তীরে অবস্থিত এই পাঁচ শতাব্দীরও বেশি পুরনো গ্রামটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক গন্তব্য হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প, গ্রামীণ পরিবেশ আর জীবন্ত সংস্কৃতির মেলবন্ধন থান হাকে আলাদা করে তুলেছে অন্য সব পর্যটন স্পট থেকে।

হোই আন প্রাচীন শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত থান হা মৃৎশিল্প গ্রামটি দীর্ঘদিন ধরেই কোয়াং নাম অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত। প্রায় ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে এই গ্রামটি তার ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং প্রাচীন কারুশিল্প তৈরির প্রক্রিয়া প্রায় অবিকৃত অবস্থায় ধরে রেখেছে। আধুনিকতার চাপ সত্ত্বেও এখানকার জীবনযাত্রা ও কারিগরি ধারা আজও অতীতের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।

বর্তমানে থান হা গ্রামের সরু রাস্তা, নদীতীর আর কর্মশালাগুলোতে প্রতিদিনই দেখা যায় পর্যটকদের ব্যস্ত উপস্থিতি। দেশি দর্শনার্থীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগমন গ্রামটির পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। অনেক পর্যটকই হোই আন ভ্রমণের সময় বিশেষভাবে থান হা গ্রামকে তাদের ভ্রমণসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করছেন, কারণ এখানে এসে শুধু দেখাই নয়, বরং হাতে-কলমে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প তৈরির অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

গ্রামের মৃৎশিল্প কর্মশালাগুলোই থান হার মূল আকর্ষণ। এখানে দর্শনার্থীদের স্বাগত জানান অভিজ্ঞ কারিগররা, যারা ধৈর্যসহকারে মৃৎশিল্প তৈরির প্রতিটি ধাপ দেখান। মাটির চাকা ঘোরানো, কাঁচা মাটিকে আকার দেওয়া, ছাঁচে ঢালাই করা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পণ্য তৈরি—সবকিছুই পর্যটকরা নিজের চোখে দেখতে এবং নিজ হাতে চেষ্টা করতে পারেন। অনেকেই এই অভিজ্ঞতাকে তাদের ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় অংশ বলে মনে করেন।

বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে নিজ হাতে একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন তৈরি করার আগ্রহ চোখে পড়ে। কারিগরদের নির্দেশনায় তারা নিজেদের নাম বা পছন্দের নকশা যুক্ত করে ছোট মৃৎপাত্র, ফুলদানি কিংবা স্মারক তৈরি করেন। এই সরাসরি অংশগ্রহণ পর্যটকদের সঙ্গে গ্রামের মানুষের একটি মানবিক সংযোগ তৈরি করে, যা সাধারণ পর্যটন অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক গভীর।

বর্তমানে থান হা মৃৎশিল্প গ্রামে ৩৭টিরও বেশি পরিবার সক্রিয়ভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। মোট ৬৮ জন কারিগর এখানে নিয়মিত কাজ করেন, যাদের মধ্যে পাঁচজন প্রাদেশিক পর্যায়ের স্বীকৃত কারিগর। তারা শুধু উৎপাদনেই যুক্ত নন, বরং পর্যটকদের জন্য প্রদর্শনী, কর্মশালা এবং অভিজ্ঞতামূলক কার্যক্রম পরিচালনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অনেক কারিগরই প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাটিতে প্রাণ সঞ্চার করছেন, যাতে এই ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও বেঁচে থাকে।

পর্যটন থেকে অর্জিত আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ গ্রামের কারিগরদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। তাদের দক্ষতা ও কমিউনিটি পর্যটনে অবদানের ভিত্তিতে নিয়মিত মাসিক পারিশ্রমিক দেওয়া হয়, যা বছরে গড়ে প্রায় ৫২.১ মিলিয়ন ভিয়েতনামি ডং পর্যন্ত পৌঁছায়। এই আর্থিক মডেল কারিগরদের পেশায় টিকে থাকতে উৎসাহ দিচ্ছে এবং গ্রামভিত্তিক পর্যটনকে টেকসই করে তুলছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে থান হা মৃৎশিল্প গ্রামে মোট দর্শনার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৩৭ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার মধ্যে ২ লাখ ১০ হাজারেরও বেশি হবেন বিদেশি পর্যটক। এর ফলে গ্রামটির মোট আয় ৮.৩ বিলিয়ন ভিয়েতনামি ডংয়ের বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়ন একসঙ্গে এগোতে পারে।

এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবেই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে থান হা মৃৎশিল্প গ্রাম ভিয়েতনাম পর্যটন পুরস্কার ২০২৫-এ “সেরা কমিউনিটি পর্যটন গন্তব্য” হিসেবে সম্মাননা লাভ করে। একটি সাধারণ নদীতীরবর্তী কারুশিল্প গ্রাম থেকে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হওয়া থান হার জন্য বড় অর্জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, থান হা গ্রাম ভিয়েতনামে ঐতিহ্য সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটনের একটি আদর্শ মডেল। দা নাং অঞ্চলের পর্যটন বিকাশের মধ্যেও এই ৫০০ বছরের পুরনো গ্রামটি তার নিজস্ব চরিত্র ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনের সঙ্গে পর্যটনকে যুক্ত করার এই প্রয়াস দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আকর্ষণ হয়ে থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Read Previous

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধন নয়

Read Next

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে টিকিট জালিয়াতির ১০টি চক্র শনাক্ত, ট্রাভেল এজেন্টসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular