ডিসেম্বরে পর্যটনে ফিরছে গতি, দেশের হোটেল–রিসোর্টের ৬০–৮০ শতাংশ কক্ষ ভরা

ঝর্ণা

ফাইল ছবি

নিজেস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : ডিসেম্বর এলেই দেশের পর্যটন খাতে ব্যস্ততা বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরের ডিসেম্বরেও তার ব্যতিক্রম নয়। কক্সবাজার, সাজেক, সিলেট, হবিগঞ্জ ও সেন্ট মার্টিনসহ দেশের প্রধান পর্যটন এলাকাগুলোতে হোটেল ও রিসোর্টগুলোর ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ ইতোমধ্যে পর্যটকে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই চিত্র স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে, দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর দেশের পর্যটন খাত আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ধারায় ফিরছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর ছিল ব্যতিক্রমী ও হতাশাজনক। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার নানা সমস্যার কারণে সে বছর পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। অনেকেই ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন কিংবা স্বল্প সময়ের সফরে সীমাবদ্ধ ছিলেন। তবে চলতি বছরে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় পর্যটকেরা আবার ভ্রমণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

বাংলাদেশে পর্যটনের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। শীতকালীন আবহাওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি এবং করপোরেট ভ্রমণের কারণে এই সময়ে পর্যটনের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮–১৯ অর্থবছরে পর্যটন খাত দেশের জিডিপিতে প্রায় ৩ শতাংশ এবং মোট কর্মসংস্থানে প্রায় ৮ শতাংশ অবদান রেখেছে। ফলে এই খাতে সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তনও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কক্সবাজারে পর্যটনের প্রাণচাঞ্চল্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। সি পার্ল বিচ রিসোর্টের সেলস ও মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক আব্দুল আওয়াল জানান, ডিসেম্বর মাসে তাদের রিসোর্টের প্রায় ৬০ শতাংশ কক্ষ পর্যটকে ভরা। তার ভাষায়, ২০২৩ সালে যেমন ব্যবসা ছিল, চলতি বছরেও প্রায় একই রকম অবস্থা ফিরে এসেছে। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৪ সাল ছিল পুরোপুরি ব্যতিক্রম। এখন আবার রিসোর্টের কার্যক্রম স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে।

তিনি আরও জানান, কক্সবাজারে অধিকাংশ পর্যটক দুই দিনের বেশি থাকেন না। সমুদ্রসৈকত প্রধান আকর্ষণ হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের সুযোগ সীমিত। তবে করপোরেট বুকিং, কনভেনশন ও গ্রুপ ইভেন্টগুলো রিসোর্ট ব্যবসার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে।

কক্সবাজারের মারমেইড বিচ রিসোর্টেও একই রকম চিত্র দেখা যাচ্ছে। রিসোর্টটির অপারেশন ম্যানেজার রানা কর্মকার জানান, সামনে নির্বাচন থাকলেও ডিসেম্বর মাসে তাদের ব্যবসা ভালো চলছে। বর্তমানে রিসোর্টের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকড, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের কাছাকাছি। তবে তিনি জানান, বাইরের রেস্তোরাঁয় অতিথির সংখ্যা আগের তুলনায় কমে গেছে, বিশেষ করে বিদেশি পর্যটক উল্লেখযোগ্যভাবে কম আসছেন।

তার মতে, নিরাপত্তা শঙ্কা এবং সড়ক যোগাযোগের দুরবস্থার কারণে অনেক পর্যটক রিসোর্টের ভেতরেই সময় কাটাচ্ছেন। আগে যারা রিসোর্টে না থেকেও খাবারের জন্য রেস্তোরাঁয় আসতেন, এখন সেই প্রবণতা কমে গেছে।

কক্সবাজারের বাইরে অন্যান্য পর্যটন এলাকাগুলোতেও মিশ্র অভিজ্ঞতার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। হবিগঞ্জের বাহুবলে অবস্থিত দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টের সিনিয়র সুপারভাইজার এমডি বাহার খান জানান, চলতি ডিসেম্বরে তাদের রিসোর্টে গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ কক্ষ ভরাট থাকছে। এটি ২০২৩ সালের তুলনায় কিছুটা কম। তার মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি ঢাকা–সিলেট মহাসড়কে চলমান সংস্কার কাজের কারণে যাত্রাপথ দীর্ঘ হচ্ছে, যা অনেক পর্যটককে নিরুৎসাহিত করছে। তবুও মৌসুম হিসেবে ব্যবসা একেবারে খারাপ নয় বলে তিনি মনে করেন।

ট্যুর অপারেটরদের অভিজ্ঞতায় উঠে আসছে আরও কিছু বাস্তব চিত্র। ট্যুর গ্রুপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরানুল আলম জানান, পর্যটন ব্যবসা মোটামুটি চললেও লাভের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। তিনি বলেন, সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের চাহিদা থাকলেও জাহাজের টিকিট সংকট, দীর্ঘ যাত্রা এবং জেটিতে ভিড় পর্যটকদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার ভাষায়, এখন সেন্ট মার্টিন যেতে সমুদ্রপথে ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। বোর্ডিং ও জাহাজ থেকে নামতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়। এসব কারণে অনেক পর্যটক ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় সন্তুষ্ট হচ্ছেন না। যারা আগে নিয়মিত ভ্রমণ করতেন, তারা এখন আর আসছেন না এবং নতুন পর্যটকদেরও নিরুৎসাহিত করছেন।

তবে পর্যটকদের পছন্দে একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে জানান তিনি। অনেকেই এখন কম ভ্রমণ করলেও আরামদায়ক, নিরাপদ এবং মানসম্মত রিসোর্ট বেছে নিচ্ছেন। খরচ বেশি হলেও সেবার মানকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

পার্বত্য এলাকার পর্যটন কেন্দ্র সাজেকেও ব্যস্ততা বেড়েছে। সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণা দেব বর্মন জানান, ডিসেম্বরে সাজেকের প্রায় ৭০ শতাংশ রিসোর্ট কক্ষ পর্যটকে ভরা। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে প্রচণ্ড চাপ থাকে। ডিসেম্বরের শেষের দিকে বেশ কয়েক দিন প্রায় সব রিসোর্টই সম্পূর্ণ বুক হয়ে যায়।

বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. রফিউজ্জামান বলেন, চলতি ডিসেম্বর মাসে সামগ্রিক পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় ভালো। বুকিং প্রায় স্বাভাবিক মৌসুমের মতো। যদিও নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রভাব ফেলেছে, তবুও নতুন সরকার গঠনের পর পর্যটন খাতে আরও ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করছেন তিনি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের পর্যটন খাত এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি, তবে ঘুরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। নিরাপত্তা জোরদার, সড়ক ও নৌ যোগাযোগের উন্নয়ন এবং পর্যটন পণ্যে বৈচিত্র্য আনা গেলে এই খাত আবারও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলো শরীফ ওসমান হাদী, অবস্থা আশঙ্কাজনক

Read Next

বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার ঢল, ইতিহাসের কাছে নতুন করে নতজানু জাতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular