১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছুটির দিনে সন্তোষপুর: বানরের সঙ্গে অভূতপূর্ব মিলন ও প্রকৃতির অপরূপ সান্নিধ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : ঢাকা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুর রাবারবন এখন পর্যটকদের কাছে এক নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার রাবারগাছের ঘন সবুজ ছায়ায় লুকিয়ে থাকা বন্য বানরের দল, পাখির কলতান আর নির্মল প্রকৃতির সান্নিধ্যে একদিনের ছুটি কাটাতে চাইলে সন্তোষপুর হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। সম্প্রতি একদল ভ্রমণপিয়াসী যুবকের অভিজ্ঞতা থেকে জানা গেছে, এখানে এসে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অদ্ভুত মিলন ঘটে, যা সহজে ভোলার নয়।

ভোর চারটায় ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে যানজটের কবলে পড়েও দুপুর সাড়ে এগারোটার মধ্যে ফুলবাড়িয়ার কান্দানিয়া গ্রামে পৌঁছে যান ভ্রমণকারীরা। স্থানীয় সাংবাদিক বন্ধুর পরামর্শ অনুসারে প্রথমেই ঘুরে নেওয়া হয় দুলমা গ্রামের দীপ্তি অর্কিডস বাগান। প্রায় ২৬ একর জুড়ে বিস্তৃত এই বাগানে প্রবেশ করতেই চোখ জুড়িয়ে যায় নানা রঙের অর্কিড ফুলের সমারোহে। লাল, হলুদ, সাদা, বেগুনি—বিভিন্ন রঙের ফুল শক্ত পাতার আবরণে ফুটে থাকা যেন প্রকৃতির এক অনন্য শিল্পকর্ম। বাগানজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দেশি-বিদেশি নানা জাতের গাছপালা ও পাখির অবিরাম কলতান ভ্রমণকারীদের মন ভরিয়ে দেয়। নামাজ শেষে তাঁরা চলে যান টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার গুপ্ত বৃন্দাবন গ্রামে। ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল জেলার সীমানায় অবস্থিত এই গ্রামে রয়েছে একটি প্রাচীন তমালগাছ (বা বিরল প্রজাতির বৃক্ষ), যার বয়স শতাধিক বছর বলে ধারণা করা হয়। গাছটি একবার মারা যাওয়ার প্রায় ১২ বছর পর আবার নতুন করে ডালপালা গজিয়ে উঠেছে, যা স্থানীয়দের কাছে অলৌকিক বলে বিবেচিত। বর্তমানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-অর্চনার স্থান হিসেবেও এটি পরিচিত। প্রকৃতি ও বৃক্ষপ্রেমীরা এই বৃক্ষকে দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আসেন।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে ভ্রমণকারীরা পৌঁছে যান সন্তোষপুর রাবারবাগানে। সুনসান নিরিবিলি গ্রাম্য পথ ধরে গাড়ি চলার সময় দুই পাশে পাকা ধানের সুগন্ধ আর সিজনের আনারসের মিষ্টি ঘ্রাণ যেন তাদের স্বাগত জানায়। গাড়ি থামে বনের ভেতর রাবার প্রক্রিয়াকরণ কারখানার সামনে। সেখান থেকে হেঁটে বিট অফিসের দিকে যাওয়ার পথে চোখে পড়ে ১০৬ একর জুড়ে বিস্তৃত নয়নাভিরাম সন্তোষপুর বনাঞ্চল। শাল, গজারি সহ নানা জাতের গাছের সঙ্গে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে গড়ে তোলা রাবারবাগান এখানকার প্রধান আকর্ষণ। বুনো ঘ্রাণ আর শেষ বিকেলে ঘরে ফেরা পাখির কিচিরমিচির শুনতে শুনতে যখন তাঁরা বিট অফিসের সামনে পৌঁছান, তখন দেখা যায় বানরের এক অভূতপূর্ব সমাবেশ। নানা বয়স ও আকারের শত শত বানর যেন সেখানে সভা বসিয়েছে।

দোকান থেকে কলা ও বাদাম কিনে ভ্রমণকারীরা বানরদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠেন। আশ্চর্যজনকভাবে বানরগুলো নির্ভয়ে তাদের কোলে, কাঁধে উঠে বসে। কোনো ভয় বা আক্রমণাত্মক আচরণ নয়, বরং যেন পুরনো পরিচিতের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই বনে বিরল প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় প্রায় ৫০০টি বানর রয়েছে। আশির দশকে প্রাকৃতিক বনের বুকে রাবারবাগান সৃজন এবং মানুষের উৎপাতের কারণে অনেক প্রাণী হারিয়ে গেলেও বানরকুল কোনোরকমে টিকে আছে। বন বিভাগ থেকে বানরের জন্য খাবার বরাদ্দ থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। ফলে দর্শনার্থীদের দেওয়া খাবারই এখন তাদের প্রধান ভরসা। স্থানীয়রা এদের ‘সামাজিক বানর’ বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ এরা সাধারণত কাউকে উৎপাত করে না। তবে খাবার না দিলে অসহায়ভাবে দর্শনার্থীর কাঁধে বা কোলে বসে থাকে, যা অনেককেই শেষ পর্যন্ত কিছু খাবার কিনতে বাধ্য করে।

এই অভূতপূর্ব মিলনের মাঝে সন্ধ্যা নেমে আসে। বানরদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ভ্রমণকারীরা ফিরতি পথ ধরেন। তবে তাঁদের অভিজ্ঞতা বলে, সন্তোষপুর শুধু একটি ভ্রমণস্থল নয়, বরং প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের এক অনন্য সেতুবন্ধনের উদাহরণ। এখানে এসে অনেকেই উপলব্ধি করেন, কীভাবে মানুষের কারণে বন্যপ্রাণীদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ছে এবং কীভাবে দর্শনার্থীদের সচেতনতা ও সহযোগিতা তাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করতে পারে।

যাওয়ার উপায়
নিজস্ব বা ভাড়ার গাড়ি নিয়ে সরাসরি যাওয়াই সবচেয়ে সুবিধাজনক। তবে বাসযাত্রীরা ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহগামী বাসে উঠে ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডে নামতে পারেন। সেখান থেকে অটোরিকশা বা সিএনজি নিয়ে দীপ্তি অর্কিড বাগান ও সন্তোষপুর রাবারবাগান ঘুরে আসা যায়। যারা শুধু বানর দেখতে চান, তারা ফুলবাড়িয়া উপজেলা পরিষদের সামনে থেকে সরাসরি অটোরিকশায় সন্তোষপুরে চলে যেতে পারেন।

সন্তোষপুরের এই রাবারবন ও বানরপল্লি শুধু ছুটির দিনের বিনোদন নয়, বরং পরিবেশ সচেতনতা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের একটি জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে। যারা প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চান এবং বন্যপ্রাণীর সঙ্গে অদ্ভুত এক সখ্যতা অনুভব করতে চান, তাদের জন্য সন্তোষপুর এক অসাধারণ গন্তব্য। আগামী ছুটির দিনে পরিকল্পনা করে চলে যান—প্রকৃতি ও বানরেরা অপেক্ষায় থাকবে।

প্রতিবেদক : ইসলাম রাইসুল

Read Previous

রাজধানীর বনানীতে কাপড়ের গুদামে আগুন, দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর নিয়ন্ত্রণে

Read Next

কক্সবাজার বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে: মন্ত্রী আফরোজা খানম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular