
খুলনা জেলার দক্ষিণে বিস্তৃত বিশ্বখ্যাত সুন্দরবন।
খুলনা জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। এ জেলার দক্ষিণে বিস্তৃত বিশ্বখ্যাত সুন্দরবন, যা ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য। খুলনা শহর জেলার প্রধান নগরী এবং দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবে পরিচিত। এটি রূপসা ও ভৈরব নদীর তীরে অবস্থিত, যা শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। খুলনা শিল্প ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সমৃদ্ধ, বিশেষ করে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চিংড়ি শিল্পে দেশের অগ্রণী ভূমিকা রাখে। এখানকার মংলা বন্দর দেশের দ্বিতীয় প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে পরিচিত। খুলনায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যাদুঘর, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ধর্মীয় উপাসনালয় রয়েছে। এখানকার লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনধারা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক বৈচিত্র্যে খুলনা জেলা বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে পরিচিত। আসুন দেখে নেই খুলনার কিছু দর্শনীয় স্থান।
১. সুন্দরবন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, কুমির ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও উদ্ভিদের আবাসস্থল।

২. শাটখোলা ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের প্রবেশপথে থাকা এই বনভূমি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে এবং নৌকাভ্রমণের সুযোগ রয়েছে।
৩. দাকোপের ফাতেখান মসজিদ মোগল আমলের প্রাচীন মসজিদ। সুন্দর কারুকাজ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
৪. লাবণ্যবতী নদী এই নদী দর্শনার্থীদের কাছে নৌকা ভ্রমণ ও প্রকৃতির শোভা উপভোগের জন্য জনপ্রিয়।
৫. রূপসা সেতু খুলনা শহরের সাথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংযোগ স্থাপনকারী গুরুত্বপূর্ণ সেতু। এটি রূপসা নদীর উপর নির্মিত।
৬. খুলনা শহীদ হাদিস পার্ক স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত একটি পার্ক ও মুক্তমঞ্চ।

৭. খুলনা জেলা যাদুঘর এখানে প্রাচীন নিদর্শন, ছবি, অস্ত্র ও নানান ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষিত আছে।
৮. ত্রিশ মাইল বাজার (মংলা রোড) এটি খুলনা-মংলা মহাসড়কে অবস্থিত একটি বিখ্যাত বাজার ও জংশন।
৯. মংলা সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর। এটি দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় একটি স্থান।

১০. শিববাড়ি মন্দির খুলনা শহরের একটি প্রাচীন ও পূণ্যত্ম মন্দির যা হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১১. দাকোপের কোটাকালিনগর গ্রাম গ্রামীণ জীবনের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা একটি নিরিবিলি গ্রাম।
১২. পাইকগাছার হরিনখোলা নদীঘেরা গ্রাম এবং পাখিদের জন্য বিখ্যাত একটি স্থান।
১৩. খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বিস্তৃত সবুজ ক্যাম্পাস এবং আধুনিক স্থাপত্যে ঘেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
১৪. খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ ঐতিহাসিক ও শিক্ষাবিষয়ক গুরুত্বসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠান যার চত্বর সাজানো ও সবুজে ঘেরা।
১৫. দিঘলিয়ার ঐতিহাসিক রুপসা ঘাট এখান থেকে রূপসা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়, যা অনেক সাহিত্যেও উঠে এসেছে।
১৬. তেরখাদা বিলাঞ্চল বর্ষাকালে নৌকাভ্রমণ এবং শীতকালে শুশুক ও পরিযায়ী পাখির জন্য বিখ্যাত।
১৭. জয়মন্তপুর জমিদার বাড়ি পুরনো জমিদার আমলের বাড়ি, যা ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ ও দৃষ্টিনন্দন।
১৮. বটিয়াঘাটা গির্জা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের একটি প্রাচীন উপাসনালয় এবং স্থাপত্যশৈলীতে অনন্য।
১৯. সোনাডাঙ্গা পার্ক শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত এই পার্কে শিশুদের খেলার জায়গা ও পরিবার নিয়ে ঘোরার উপযোগী পরিবেশ রয়েছে।
২০. গল্লামারি স্মৃতিসৌধ মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ। এটি ঐতিহাসিক এবং আবেগঘন একটি স্থান।
সতর্কতা
ভ্রমণের সময় কিছু সতর্কতা ও প্রস্তুতি মেনে চললে ভ্রমণটি হবে নিরাপদ ও আনন্দদায়ক। নিচে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সতর্কতা তুলে ধরা হলো—
নিরাপত্তা—
• অচেনা এলাকা বা জঙ্গলে (বিশেষ করে সুন্দরবন) একা প্রবেশ করবেন না।
• সুন্দরবনে গেলে অভিজ্ঞ গাইড বা বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে যান।
• স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা ও সময়সূচি মেনে চলুন।
স্বাস্থ্য—
• মশাবাহিত রোগ (ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া) প্রতিরোধে মশার স্প্রে বা ক্রিম ব্যবহার করুন।
• বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখুন, বোতলজাত পানিই ভালো।
আবহাওয়া—
• বর্ষাকালে বন্যা বা অতিরিক্ত বৃষ্টির ঝুঁকি থাকে, সে সময় ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন।
• সানস্ক্রিন, ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখুন।
প্রাকৃতিক পরিবেশ—
• সুন্দরবনে প্লাস্টিক বা দূষণকারী কিছু ফেলবেন না।
• বন্যপ্রাণীর প্রতি সম্মান দেখান। ওদের বিরক্ত করবেন না।
সাধারণ পরামর্শ—
• জরুরি নম্বর, গাইড বা স্থানীয় হোটেলের যোগাযোগ তথ্য সঙ্গে রাখুন।
• স্থানীয় সংস্কৃতি ও আচরণবিধি সম্মান করুন।
• পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন।



