
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ভারতের মেঘালয় রাজ্যের আবহাওয়া বরাবরই আলাদা। শীত এখানে নামে আগেভাগে, দীর্ঘ সময় থাকে, আর বছরের বেশির ভাগ সময়েই বৃষ্টি লেগে থাকে কমবেশি। এই জলবায়ুর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড় অঞ্চলেও। বিশেষ করে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় তৈরি হয়েছে এমন এক অনুকূল পরিবেশ, যেখানে ফুল চাষ নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাহাড়ের ঢালে গড়ে উঠছে রঙিন গোলাপের বাণিজ্যিক বাগান, যার ফুল প্রতিদিন পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকার বড় বড় ফুলের বাজারে।
কয়েক বছর আগেও এই পাহাড়ি এলাকাগুলো মূলত জুম চাষ, ধান বা মৌসুমি ফসলের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণ যে গোলাপ চাষের জন্য উপযোগী, তা বুঝতে পেরে একদল উদ্যোগী কৃষক ঝুঁকেছেন ফুল চাষের দিকে। শুরুটা সহজ ছিল না। নতুন ফসল, নতুন বাজার, পরিবহন ও পরিচর্যার খরচ—সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল প্রবল। তবু সাহস করে যাঁরা এগিয়েছেন, তাঁদের হাত ধরেই আজ সীমান্তাঞ্চলের কৃষিতে আসছে ভিন্ন রঙ।
ঝিনাইগাতীর সীমান্তবর্তী এক পাহাড়ি গ্রামে কয়েক বছর আগে গোলাপ চাষ শুরু করেন রাজশাহী অঞ্চলের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম নামের এক কৃষক। নিজস্ব ও লিজ নেওয়া জমি মিলিয়ে প্রায় এক একর এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন নানা রঙের গোলাপের বাগান। স্থানীয় আরেক ফুলচাষির সাফল্য দেখে এই অঞ্চলে এসে সম্ভাবনা যাচাই করেন তিনি। মাটি ও পানির নমুনা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় পরিকল্পিত চাষাবাদ। বর্তমানে তাঁর বাগানে রয়েছে প্রায় ১৮ হাজার গোলাপগাছ, যেগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি ফুল সংগ্রহ করা হয়।
এই এলাকায় গোলাপ চাষের পথিকৃৎ হিসেবে ধরা হয় স্থানীয় কৃষক রফিকুল হককে। ২০২১ সালে তিনি এক একর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে বাণিজ্যিক গোলাপ চাষ শুরু করেন। শুরুতে ঝুঁকি থাকলেও ধীরে ধীরে তাঁর বাগানের ফুল ঢাকার শাহবাগ ও আশপাশের বাজারে জায়গা করে নেয়। নিয়মিত সরবরাহ আর ভালো মানের কারণে ক্রেতাদের আস্থা তৈরি হয়। তাঁর সাফল্য দেখে আশপাশের গ্রামগুলোতেও কৃষকেরা আগ্রহী হয়ে ওঠেন গোলাপ চাষে।
গোলাপ চাষের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর দীর্ঘমেয়াদি ফলন। একবার গাছ ভালোভাবে দাঁড়িয়ে গেলে ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত নিয়মিত ফুল দেয়। তবে এর জন্য দরকার নিয়মিত পরিচর্যা, সার প্রয়োগ, ছাঁটাই এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ। পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টি বেশি হওয়ায় পানি নিষ্কাশনের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হয়। খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও লাভের সম্ভাবনাও কম নয়—এটাই বলছেন চাষিরা।
বর্তমানে এই অঞ্চলের একেকটি বাগান থেকে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার থেকে ২ হাজার পর্যন্ত ফুল সংগ্রহ করা হচ্ছে। মৌসুমভেদে একটি গোলাপের দাম ১০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। বিশেষ উৎসব বা বিয়ের মৌসুমে দাম আরও বাড়ে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকায় পাঠানো ফুল থেকেই মূল আয় আসে। ভোরে ফুল তোলা হয়, এরপর প্যাকেটজাত করে সড়কপথে রাজধানীতে পাঠানো হয়।
শুধু বড় চাষিরাই নন, ছোট পরিসরেও অনেকে গোলাপ চাষে সফল হচ্ছেন। ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া এলাকায় মাত্র ৩০–৪০ শতাংশ জমিতে গোলাপ চাষ করে এক দম্পতি নিয়মিত আয় করছেন। তাঁরা এক দিন পরপর কয়েক শ ফুল বিক্রি করেন স্থানীয় শহরে। ভবিষ্যতে বাগানের পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছেন তাঁরা। এই উদাহরণগুলো অন্য কৃষকদেরও উৎসাহিত করছে বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকতে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গারো পাহাড় অঞ্চলের জলবায়ু গোলাপ চাষের জন্য বেশ উপযোগী। পাহাড়ি ঢালে ঠান্ডা আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টি আর মাটির গঠন—সব মিলিয়ে এখানে ফুল চাষের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় চার হেক্টরের বেশি জমিতে গোলাপের বাগান গড়ে উঠেছে। এসব বাগান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার ফুল দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ হচ্ছে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। পরিবহন খরচ, বাজারের ওঠানামা, রোগবালাই এবং প্রশিক্ষণের অভাব অনেক সময় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কৃষকেরা বলছেন, সরকারি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ বাড়লে এই অঞ্চলে ফুল চাষ আরও বিস্তৃত হতে পারে। আধুনিক প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও সরাসরি বাজার সংযোগ হলে লাভের পরিমাণও বাড়বে।
সব মিলিয়ে গারো পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা এই গোলাপ বাগান শুধু ফুলের সৌন্দর্যই ছড়াচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে সীমান্তাঞ্চলের কৃষির চিত্র। পাহাড়ি জনপদের মানুষের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন আয়ের উৎস, নতুন স্বপ্ন। অনুকূল আবহাওয়া আর উদ্যোক্তা মনোভাব থাকলে যে কৃষিতে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব—গারো পাহাড়ের রঙিন গোলাপ তারই জীবন্ত প্রমাণ।



