
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : মাসজুড়ে স্থবিরতা, অনিশ্চয়তা আর অচলাবস্থার পর অবশেষে প্রাণ ফিরে পেয়েছে ওয়াশিংটনের জাদুঘরপাড়া। সরকার পুনরায় চালু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শহরের জাদুঘরগুলোর সামনে লম্বা লাইন দেখা যায়—যেন অপেক্ষার শেষ নেই। ভেতরে ঢোকার মুহূর্তে মানুষের মুখে যে স্বস্তি আর উত্তেজনা, সেটা বলে বোঝানো কঠিন।
শুক্রবার সকালে ঠিক এমনই দৃশ্য দেখা গেছে স্মিথসোনিয়ান এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের সামনে। ঝুলন্ত বিমান, স্পেস মডিউল আর উড়োজাহাজের ইতিহাস ঘিরে সাজানো বিশাল প্রদর্শনী আবার দেখতে পেয়ে দর্শনার্থীদের মধ্যে দারুণ উচ্ছ্বাস কাজ করেছে।
অপেক্ষার ক্লান্তি ঝেড়ে নতুন শুরু
টেক্সাস থেকে আসা নিক অ্যাডামস তার ছেলেকে নিয়ে মিউজিয়ামে ঢোকার মুহূর্তে হাসি আটকাতে পারছিলেন না। একমাস ধরে পরিকল্পনা করা ভ্রমণটা যেন একেবারে থমকে ছিল। তিনি বলছিলেন, কতদিন ধরে অনিশ্চয়তায় ছিলেন—চলবে কিনা, খুলবে কিনা, না আবার ফেরত যেতে হবে। কিন্তু অবশেষে সব খুলে গেছে, আর সেই অপেক্ষা সার্থক হওয়ায় তিনি বেশ চনমনে।
ওয়াশিংটন শুধু রাজনৈতিক রাজধানী নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ভান্ডার। এখানে থাকা এক ডজনেরও বেশি জাদুঘর সারা বছর লাখো পর্যটক টানে। আগের বছরই প্রায় এক কোটি ষাট লাখ মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানে ঘুরে গেছে। তাই এদের হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া শহরের অর্থনীতি থেকে শুরু করে মানুষের মন—সব জায়গায়ই একটা ফাঁক তৈরি করেছিল।
কিন্তু বাজেট অচলাবস্থার জেরে সব জাদুঘর ১ অক্টোবর থেকে বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৪৩ দিনের স্থবিরতা ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ শাটডাউন হিসেবে রেকর্ড হয়। এ সময়ে জাদুঘরের কর্মীদের অনেককে ছুটিতে পাঠানো হয়, কেউ কেউ বেতন ছাড়াই কাজ করেছেন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভালো ছিল না।
পুনরায় জাগরণে শহর জুড়ে স্বস্তির হাওয়া
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের টানাপড়েনের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত একটি অস্থায়ী ব্যয় বিল পাস হয়, আর তাতেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকার পুনরায় চালু করেন। ঠিক এরপর থেকেই শহরে যেন নতুন করে দম নেয় মানুষ।
জার্মান পর্যটক জোহানা টেনিগকেট তার সঙ্গীসহ জাদুঘরগুলো খোলা দেখে খুশিতে আবেগাপ্লুত। তিনি বলছিলেন, এত দূর থেকে এসে সব বন্ধ পাওয়ার ভয়টা তাকে বেশ অস্থির করেছিল। শুধু পর্যটক নয়, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা কাজ করেন তাদের কথাও মনে পড়ে তার—লম্বা সময় বেতন ছাড়া থাকা নিশ্চয়ই সহজ ছিল না।
প্রথমবার ওয়াশিংটনে—উত্তেজনা থামছে না
ওয়াশিংটনের স্থানীয় বাসিন্দা মিতজি সোবাশ তার চাচাতো বোন ডোরিটা ভার্গাসকে নিয়ে ঢুকছিলেন জাদুঘরে। ভার্গাস প্রথমবারের মতো শহরে এসেছেন। সোবাশ বললেন, প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে কোথাও যেতে পারছেন না। আর এ শহরে এসে জাদুঘর না দেখা মানে ভ্রমণটাই অপূর্ণ। শাটডাউন শেষ হতেই যেন তিনি আর অপেক্ষা করেননি।
ডোরিটার উত্তেজনাও চোখে পড়ার মতো। তিনি বলছিলেন, এতদিন ধরে শুনেছেন ওয়াশিংটনের জাদুঘরগুলো কত অসাধারণ—নিজে এসে তা দেখার সুযোগ মিলেছে। তার কথায় ছিল এক ধরনের স্বস্তি, যেন সব ঠিকঠাক মিলেছে বলেই এই যাত্রা সফল।
ভিড় জমল সকাল থেকেই
এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের দরজা খোলার আধ ঘণ্টা আগে থেকেই প্রায় শতাধিক মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। অনেকে আগের রাতেই অনলাইনে টিকিট পেতে হিমশিম খেয়েছেন। ট্র্যাফিক এতটাই বেশি ছিল যে মোবাইল অ্যাপ হ্যাং হয়ে যাচ্ছিল। টেনিগকেট বলছিলেন, ভাগ্য ভালো তার ফোনে বুকিং কাজ করেছে।
তার পরিকল্পনা স্পষ্ট—যত বেশি সম্ভব স্মিথসোনিয়ান জাদুঘর দেখা। বিশেষ করে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম তাকে সবচেয়ে বেশি টানে।
কর্মীরা ফিরে পেলেন কাজের ছন্দ
শাটডাউনের সময় জাদুঘরের কর্মীদের পরিস্থিতি ছিল বেশ কঠিন। অনেকেই ছুটি নিয়েছিলেন, আবার কিছু বিভাগে কর্মীরা বিনা বেতনে কাজ চালিয়ে গেছেন। তাই জাদুঘর খুলে যাওয়ার খবর তাদের জন্য আরও বড় স্বস্তি।
নিক অ্যাডামসের কথায় এটা পরিষ্কার—তিনি খুশি শুধু নিজের জন্য নন, বরং যারা এসব প্রতিষ্ঠান চালিয়ে রাখেন তাদেরও জন্য। সব পক্ষ আলোচনা টেবিলে এসে যে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে, সেটাই তার কাছে স্বস্তির।
শহর ফিরে পেল হারানো গতি
জাদুঘরগুলো আবার খুলে যাওয়া মানে শুধু পর্যটকের ভিড় নয়। পুরো শহরের পর্যটন অর্থনীতি, রেস্তোরাঁ, পরিবহন—সব আবার জেগে উঠছে। এটি ওয়াশিংটনের প্রাণের অংশ, আর সেটাই ফের ফিরে এসেছে।
যে প্রশ্নটা এতদিন ঝুলে ছিল—শহরের সাংস্কৃতিক হৃদস্পন্দন আবার শোনা যাবে কিনা—সেটার উত্তর পাওয়া গেছে। মানুষ ফিরেছে, উচ্ছ্বাস ফিরেছে, আর ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক জাদুঘরগুলো আবার তাদের পুরোনো চেনা ছন্দে।
কোনো অংশ আরও বিস্তৃত বা নতুন অ্যাঙ্গেলে চাইলে জানাও।



