
নিজস্ব প্রতিবেদক, পর্যটন সংবাদ: একদিনের ছুটিতে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে কাছাকাছি কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা অনেকেরই থাকে। ঢাকার খুব কাছেই অবস্থিত একটি চমৎকার গন্তব্য হচ্ছে সোনারগাঁও—যা একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী, অন্যদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। ইতিহাস, সংস্কৃতি, কারুশিল্প আর নিরিবিলি পরিবেশ—সবকিছু একত্রে উপভোগ করতে চাইলে সোনারগাঁও হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণ গন্তব্য।
প্রাচীন রাজধানীর পথে যাত্রা
সোনারগাঁও ঢাকার কাঁচপুর ব্রিজ অতিক্রম করে মাত্র ১ ঘণ্টার পথ। খুব সকালে রওনা হলে দিনের পুরোটা সময় জুড়ে এখানে ঘুরে দেখা সম্ভব। যাত্রা পথে প্রাইভেট কার, বাইক বা সিএনজি ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে লোকাল বাসেও পৌঁছানো যায় সোনারগাঁওয়ের মুল ফটকে।
শুরুটা পানাম নগর থেকে
সোনারগাঁও ঘুরে দেখার শুরুতেই চলে যাওয়া যায় ঐতিহাসিক পানাম নগর। এই নগরী মূলত মোঘল যুগের ধনী হিন্দু ব্যবসায়ীদের স্থাপিত একটি বসতি। পুরো এলাকায় লম্বা সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় শতাধিক ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের পুরনো ভবন। প্রতিটি ভবনের দরজা-জানালা আর কারুকাজে যেন ইতিহাস কথা বলে। ভ্রমণকারীরা এখানে এসে ছবি তোলা, ভিডিও নির্মাণ, আর ইতিহাস জানার পাশাপাশি সময় কাটান সৃজনশীল ও মানসিক প্রশান্তির মাঝে।
লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর: ঐতিহ্যের আধার
পানাম নগর থেকে কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলে রয়েছে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, যা স্থানীয়ভাবে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর নামে পরিচিত। এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতি, পোশাক, মৃৎশিল্প, বাঁশ ও বেতজাত সামগ্রী, কাঠের কাজ, পালাগান এবং নানা ঐতিহ্যবাহী উপকরণের প্রদর্শনী রয়েছে।
জাদুঘরের পাশে রয়েছে নান্দনিক উদ্যান, পুকুর ঘাট, লেকের ওপর ব্রিজ এবং শিশুদের খেলার জায়গা। পুরো জায়গাটি ঘুরে দেখতে সময় লাগে ১-২ ঘণ্টা। প্রবেশ মূল্যও সাধ্যের মধ্যে (প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৩০ টাকা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা)।
পাট ও নৌকা শিল্পের গল্প
লোকজ শিল্পের পাশাপাশি সোনারগাঁও বিখ্যাত ছিল পাট শিল্পের কেন্দ্রস্থল হিসেবে। জাদুঘরের পাশেই প্রদর্শিত রয়েছে বিভিন্ন ধরণের ঐতিহ্যবাহী নৌকা, যা এক সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবহৃত হতো।
বিশেষ করে বর্ষাকালে এই লেক এবং পুকুর ঘিরে সৃষ্ট প্রাকৃতিক পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও মোহময়।
স্থানীয় খাবার ও কেনাকাটা
সোনারগাঁওয়ে ঘুরতে এসে স্থানীয় বাজার থেকে ভাপা পিঠা, ডালপুরি, ঘুগনি, ডাব, আখের রস ইত্যাদি খেতে পারেন। এখানকার হস্তশিল্প দোকানগুলো থেকে কিনতে পারেন মাটির তৈজসপত্র, নকশিকাঁথা, কাঠের খেলনা, বাঁশের তৈরি গৃহসজ্জার সামগ্রী ইত্যাদি।
কিছু পরামর্শ
- সকালে খুব ভোরে রওনা দিলে ভিড় কম পাওয়া যায়।
- পানাম নগরে প্রবেশের সময় টিকিট সংগ্রহ করতে হয় (প্রাপ্তবয়স্ক ৫০ টাকা)।
- গাইড নিয়ে ভ্রমণ করলে ইতিহাস সম্পর্কে ভালোভাবে জানা যায়।
- গরমের দিনে সঙ্গে পানি ও ছাতা রাখা উচিত।
- পরিবেশ পরিষ্কার রাখা ও স্থাপনাগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া প্রত্যেক দর্শনার্থীর দায়িত্ব।
ঢাকার খুব কাছেই এমন একটি নিভৃত, ঐতিহ্যবাহী ও সৌন্দর্যে ভরপুর স্থান হতে পারে আপনার ব্যস্ত জীবনে স্বস্তির পরশ। মাত্র একদিনের ছুটিতেই পাওয়া যায় ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রকৃতির এক অনবদ্য সংমিশ্রণ। তাই সময় পেলেই ঘুরে আসুন সোনারগাঁও থেকে—স্মৃতির খাতা হবে সমৃদ্ধ, মন হবে শান্ত।



