
নিজস্ব প্রতিনিধি। পর্যটন সংবাদ : নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন—যা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামে ‘শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর’ নামেও পরিচিত—এই বৈশাখে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের বরণ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। পহেলা বৈশাখের আনন্দ উদযাপনকে কেন্দ্র করে জাদুঘর চত্বরে আয়োজিত হচ্ছে ১৫ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব। এটি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং বাংলার আবহমান লোকশিল্প ও সংস্কৃতির জীবন্ত সংরক্ষণাগারে পর্যটকদের এক অনন্য অভিজ্ঞতা উপহার দেওয়ার সুযোগ। ঢাকা থেকে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জাদুঘর ঘিরে ইতিমধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তা, সুবিধা ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি সবকিছু ঝকঝকে করে সাজানো হয়েছে যাতে হাজারো পর্যটক স্বাচ্ছন্দ্যে ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিত হতে পারেন।
১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত এই ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের লোকশিল্পের সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও পুনরুজ্জীবনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল জয়নুল আবেদিনের গভীর দেশপ্রেম ও দূরদর্শী দর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন, আধুনিক সভ্যতার আগ্রাসনে যখন গ্রামবাংলার প্রাচীন লোকশিল্প হারিয়ে যাচ্ছে, তখন একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলা জরুরি যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করবে। সোনারগাঁওয়ের ঐতিহাসিক পানাম নগরীর পুরনো বাড়িতে শুরু হয়ে পরে ১৯৮১ সালে ১৫০ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত কমপ্লেক্সে এটি বর্তমান রূপ লাভ করে। বড় সর্দার বাড়ির ঐতিহাসিক ভবনে অবস্থিত এই জাদুঘর শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয় ও সৃজনশীলতার এক অমূল্য সংগ্রহশালা।
জাদুঘরের ভেতরে প্রায় সাড়ে চার হাজারেরও বেশি নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। সর্দার বাড়ির ১০টি গ্যালারিতে সাজানো হয়েছে পোড়ামাটির ফলক, গ্রামীণ লোকজীবনের পরিবেশ, লোকজ বাদ্যযন্ত্র, তামা-কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র, লোহার নিদর্শন, কাঠের কারুশিল্প, পটচিত্র, মুখোশ, নকশি কাঁথা, জামদানি, শতরঞ্জি, শোলার কাজ, বাঁশ-বেতের শিল্প এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী। প্রতিটি গ্যালারি যেন গ্রামবাংলার একেকটি জীবন্ত ছবি। দর্শনার্থীরা দেখতে পাবেন কৃষকের চাষাবাদ, নারীদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, মাছ ধরা, হাটবাজার—সবকিছু মাটির মূর্তি ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে। জয়নুল আবেদিন স্মৃতি জাদুঘরের পাশেই রয়েছে লোকজ স্থাপত্যকলার নমুনা। বাইরের অংশে সুন্দর বাগান, হ্রদ, পিকনিক স্পট এবং ময়ূর-আকৃতির মঞ্চ পর্যটকদের বিশ্রাম ও আনন্দের জন্য উন্মুক্ত। এখানে রয়েছে কারুশিল্প গ্রাম, লাইব্রেরি, ডকুমেন্টেশন সেন্টার এবং ক্যান্টিন—যেখানে স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়।
এই বৈশাখে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হবে ১৫ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমন্ত্রিত কারুশিল্পীরা তাদের হাতের তৈরি জামদানি, নকশি কাঁথা, মৃৎশিল্প, দারুশিল্প, হাতপাখা, কাঠখোদাই, পটচিত্র, শোলাশিল্প এবং নৃ-গোষ্ঠীর শিল্পকর্ম নিয়ে হাজির হবেন। মেলায় থাকবে লোকগান, বাউল-ভাওয়াইয়া, জারি-সারি, লোকনৃত্য এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মেলা চলবে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পর্যটকদের নিরাপত্তায় অতিরিক্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হয়েছে। গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যাতে দর্শনার্থীরা প্রতিটি গ্যালারির ইতিহাস ও তাৎপর্য বিস্তারিত জানতে পারেন। বিদেশি পর্যটকদের জন্য ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় তথ্যপত্র এবং অডিও গাইডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সোনারগাঁওয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এই জাদুঘরকে আরও আকর্ষক করে তুলেছে। মধ্যযুগে বাংলার প্রাচীন রাজধানী হিসেবে পরিচিত সোনারগাঁও ছিল বাণিজ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল। পানাম নগরের ধ্বংসাবশেষ, গোয়ালদি মসজিদসহ আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোর সঙ্গে জাদুঘর পরিদর্শন একটি সম্পূর্ণ দিনের ট্যুরে পরিণত হয়। দেশি পর্যটকদের জন্য এটি সাংস্কৃতিক শিকড় খুঁজে পাওয়ার স্থান, আর বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রত্যক্ষ প্রদর্শনী। গত বছরগুলোতে হাজারো পর্যটক এখানে এসে মেলা উপভোগ করেছেন। এবারও আশা করা হচ্ছে রেকর্ড সংখ্যক দর্শনার্থী।
পর্যটকদের সুবিধার্থে জাদুঘরের সময়সূচি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা (গ্রীষ্মকালে কিছুটা বাড়ানো)। সাপ্তাহিক বন্ধ বৃহস্পতিবার, তবে বৈশাখের বিশেষ দিনগুলোতে খোলা থাকবে। প্রবেশ ফি সাধারণত ৫০-১০০ টাকা (দেশি) এবং বিদেশিদের জন্য কিছুটা বেশি। চৌরাস্তা বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশা বা অটোতে সহজেই পৌঁছানো যায়। ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন বা প্রাইভেট কারে আসা যায় মাত্র এক ঘণ্টায়। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত পার্কিং, টয়লেট, বিশ্রামাগার ও পানির ব্যবস্থা রেখেছে।
এই উৎসব শুধু পর্যটন নয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। হাজারো কারুশিল্পী তাদের পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। নতুন প্রজন্ম লোকশিল্পের সঙ্গে পরিচিত হয়। জাদুঘরের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের টেকসই পর্যটনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, “বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতির প্রাণ। এখানে এসে পর্যটকরা শুধু দেখবেন না, অনুভব করবেন বাংলার আসল স্বাদ।”
এই বৈশাখে যারা ঢাকার কাছাকাছি কোনো সাংস্কৃতিক অভিযানে যেতে চান, তাদের জন্য সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর এক অবিস্মরণীয় গন্তব্য। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক পর্যটনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে এটি প্রতি বছর হাজারো মানুষকে আকর্ষণ করে। তাই এবারের বৈশাখে পরিবার-পরিজন নিয়ে কিংবা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে চলে আসুন সোনারগাঁওয়ে। লোকশিল্পের রঙে রাঙিয়ে নিন নতুন বছরের শুরু। বাংলার শেকড়ে ফিরে যাওয়ার এমন সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। জাদুঘরের এই বর্ণাঢ্য আয়োজন আপনাকে অপেক্ষায় রেখেছে—যেখানে ইতিহাস কথা বলে, শিল্প জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং সংস্কৃতি আপনাকে আলিঙ্গন করে।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার



