
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : আসন্ন ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে খ্যাত এই উপজেলায় পাহাড়, সমুদ্র, নদী, ঝরনা ও কৃত্রিম হ্রদের অনন্য সমন্বয় রয়েছে। স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলো পর্যটকদের বরণে পুরোপুরি প্রস্তুত। ঈদের এই ছুটিতে হাজার হাজার মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
মিরসরাইয়ের ভৌগোলিক অবস্থান এটিকে এক অনন্য পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে। একদিকে সারি সারি পাহাড় যেখান থেকে ঝরনার পানি গড়িয়ে নেমে সবুজ বনানীকে আরও মনোরম করে তুলেছে, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ সৈকত যেখানে জোয়ার-ভাটার খেলায় প্রতি মুহূর্তে নতুন রূপ ফুটে ওঠে। মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে দেশের অন্যতম ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, যা পর্যটকদের যাতায়াতকে অত্যন্ত সহজ করে দিয়েছে। উত্তর দিকে বহমান নদীর তীরে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি, মাছ ধরার নৌকা ও সাগরের গর্জন মিলে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের সৃষ্টি করে। এছাড়া মায়া হরিণ, শিয়াল, বন মোরগসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের মন কেড়ে নেয়।
এই উপজেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্পটগুলোর মধ্যে অন্যতম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ মহামায়া লেক। দুর্গাপুর ইউনিয়নের ঠাকুরদীঘি বাজার থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের কোলে ১১ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই লেকে টলটলে পানি, পাহাড়ের সৌন্দর্য, গুহা, রাবার ড্যাম ও ঝরনার অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে।পর্যটকরা এখানে বোটিং, কায়াকিং করে আনন্দ উপভোগ করেন এবং পাহাড়ি ঝরনায় গা ভিজিয়ে শরীর-মনকে সতেজ করেন। রাতে তাঁবু টাঙ্গিয়ে ক্যাম্পিংয়ের সুবিধা থাকায় অনেকে এখানে রাত্রিযাপন করেন। হান্ডি আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁয় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। মহামায়া ইকোপার্কের দায়িত্বে থাকা ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার তসলিম উদ্দিন তৌহিদ বলেন, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের জন্য সবকিছু প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যাপক ভিড়ের আশা করছি।
ঝরনাপ্রেমীদের জন্য মিরসরাই যেন স্বর্গ। খৈয়াছড়া ঝরনা এখানকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পাহাড়ের পাদদেশে সবুজ বনানীর মাঝে ঝুমঝুম শব্দে বয়ে চলা এই ঝরনায় গা ভিজিয়ে অনেকে দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি দূর করেন। অনেক পর্যটক চাঁদের আলোয় ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করতে তাঁবু টাঙ্গিয়ে রাত কাটান। এছাড়া রূপসী ঝরনা, সোনাইছড়ি ঝরনা, নাপিত্তাছড়া ঝরনা, বোয়ালিয়া ঝরনা, হরিনাকুন্ড ঝরনা, বাওয়াছড়া লেকসহ ডজনখানেক ঝরনা ও হ্রদ রয়েছে, যা প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টির নিদর্শন।
সমুদ্রপ্রেমীদের জন্য ডোমখালী সমুদ্র সৈকত ও মিরসরাই শিল্পনগর সমুদ্র সৈকত বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। ডোমখালীতে প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাঁধ ঘেঁষে জেগে ওঠা চর ও সাগরের মোহনায় অসাধারণ দৃশ্য। শিল্পনগর সৈকতে সুপার ডাইকের পাশে জোয়ার-ভাটার খেলায় সৈকত নতুন রূপ নেয়। ২০১২ সাল থেকে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নের পর এই সৈকতগুলো পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বসুন্ধরা পয়েন্টে গত কয়েক বছর ধরে হাজার হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটছে।
আধুনিক বিনোদনের জন্য আরশিনগর ফিউচার পার্ক একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। ২২ একর জায়গায় গড়ে ওঠা এই পার্কে কৃত্রিম ঝরনা, নাগরদোলা, স্পিডবোট, প্যাডেল বোট, কিডস জোন, রেস্তোরাঁ, কনভেনশন সেন্টার ও আধুনিক কটেজ রয়েছে। শতাধিক প্রজাতির গাছের ছায়ায় পিকনিক, বিয়ে বা সেমিনার আয়োজনের সুবিধা রয়েছে।
অন্যান্য আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে হিলসডেল মাল্টি ফার্ম ও মধুরিমা রিসোর্ট-এর হরিণের খামার, মুহুরী প্রজেক্ট এবং মুহুরীর চরে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য। ঈদের ছুটিতে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও সেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা সক্রিয় রয়েছেন।
শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কোলে শান্তি ও আনন্দ খুঁজতে চাইলে মিরসরাই এক অসাধারণ গন্তব্য। ঈদের এই ছুটিতে পাহাড়-সমুদ্র-ঝরনার ডাকে সাড়া দিয়ে অবিস্মরণীয় স্মৃতি গড়ে তুলুন।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



