
ছবি : তাসনুভা আলম
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ: অনেক অভিভাবকের কাছেই শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ মানে বাড়তি ঝামেলা। কেউ ভাবেন, এখন নিয়ে গেলে লাভ কী—শিশু তো কিছুই মনে রাখবে না। আবার কেউ মনে করেন, একটু বড় হলে নিলেই ভালো। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন। শিশু হয়তো জায়গার নাম বা তারিখ মনে রাখে না, কিন্তু ভ্রমণের সময় পাওয়া অনুভূতি, নিরাপত্তা, আনন্দ আর একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা তার মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়। আর এই অভিজ্ঞতাগুলোই ভবিষ্যতে তার ব্যক্তিত্ব গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। এই কারণেই আজ অনেক সচেতন অভিভাবক শিশুদের নিয়ে ভ্রমণকে বিলাসিতা নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।
শিশুদের শৈশব খুব দ্রুত কেটে যায়। এই সময়টায় তারা সবচেয়ে বেশি শেখে দেখার মাধ্যমে। ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে থাকা শেখা আর বাস্তব পৃথিবী দেখার শেখা এক নয়। ভ্রমণ শিশুকে সেই বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যেটা কোনো বই বা স্ক্রিন পুরোপুরি দিতে পারে না
স্মৃতি যা নাম মনে রাখে না, অনুভূতি ধরে রাখে
শিশুরা বড় হয়ে হয়তো বলবে না, “আমি তখন অমুক হোটেলে ছিলাম।” কিন্তু তারা মনে রাখবে বাবার হাত ধরে নতুন জায়গা ঘুরে দেখার উত্তেজনা, মায়ের সঙ্গে অচেনা খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতা, কিংবা ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকা সেই দীর্ঘ সময়টা। এসব ছোট ছোট মুহূর্তই একদিন তাদের মনে নিরাপত্তা ও ভালোবাসার অনুভূতি হিসেবে ফিরে আসে।
পরিবারের সঙ্গে কাটানো এই সময়গুলো শিশুর মনে এক ধরনের স্থায়ী আশ্রয়ের ধারণা তৈরি করে। সে শেখে, নতুন জায়গায় গেলেও পরিবার পাশে থাকলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এই বোধটাই পরবর্তীতে তার আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
ভ্রমণ মানেই নিখুঁত সফর নয়, শেখার জায়গা
শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ সব সময় মসৃণ হয় না। ফ্লাইট দেরি হতে পারে, বাসে বসে থাকতে থাকতে শিশু বিরক্ত হতে পারে, কখনো হঠাৎ কান্নাকাটি শুরু হতে পারে। অনেক অভিভাবক এসব পরিস্থিতির কথাই ভেবে পিছিয়ে যান। কিন্তু এখানেই আসল শিক্ষা লুকিয়ে আছে।
প্রথম কয়েকটি ভ্রমণ হয়তো একটু কঠিন হবে। কীভাবে শিশুকে ব্যস্ত রাখবেন, কখন খাওয়াবেন, কতটা জিনিস সঙ্গে নেবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রতিটি ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবক যেমন অভিজ্ঞ হন, তেমনি শিশুও নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে। ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে, সবকিছু সব সময় নিজের মতো হবে না, তবু শান্ত থাকা যায়।
এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই শিশুকে ধৈর্যশীল ও সহনশীল করে তোলে।
বাস্তব জীবনের নীরব পাঠ
ভ্রমণের সময় কেউ কাউকে ক্লাস নেয় না। তবু শেখা হয় সবচেয়ে বেশি। শিশুরা দেখে, কোথায় কীভাবে কথা বলতে হয়, ভিড়ের মধ্যে কীভাবে নিরাপদ থাকতে হয়, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করা উচিত। এসব শিক্ষা বইয়ের পাতায় লেখা থাকলেও, বাস্তবে না দেখলে তার মানে পুরো বোঝা যায় না।

যখন একটি শিশু দেখে ভিন্ন শহরের মানুষ ভিন্ন ভাষায় কথা বলে, ভিন্নভাবে জীবনযাপন করে, তখন তার চিন্তার জগৎ বড় হতে শুরু করে। সে বুঝতে শেখে, পৃথিবীটা শুধু তার পরিচিত পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়।
সহমর্মিতা ও বোঝাপড়া গড়ে ওঠে পথে পথে
ভ্রমণ শিশুদের সামনে জীবনের বৈচিত্র্য তুলে ধরে। কোথাও মানুষ খুব সাধারণ জীবনযাপন করছে, কোথাও আবার ব্যস্ত ও দ্রুতগতির জীবন। কেউ হাসিমুখে সাহায্য করছে, আবার কোথাও কেউ উদাসীন। এই সব দৃশ্য শিশুদের শেখায়, সবাই এক রকম নয়।
এই ভিন্নতাকে কাছ থেকে দেখার মাধ্যমেই শিশুর মধ্যে সহমর্মিতা জন্ম নেয়। সে বুঝতে শেখে, অন্যের বাস্তবতা আলাদা হতে পারে, আর সেটাকে সম্মান করা জরুরি। এই উপলব্ধিই তাকে ধীরে ধীরে একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
খাবারের মাধ্যমে সাহসী হওয়া
অনেক শিশু নতুন খাবার দেখলেই ভয় পায়। কিন্তু ভ্রমণের সময় সেই ভয়টা ধীরে ধীরে কেটে যায়। নতুন জায়গায় গিয়ে স্থানীয় খাবার চেখে দেখা তাদের জন্য এক ধরনের অভিযান হয়ে ওঠে। কেউ হয়তো প্রথমে পছন্দ করে না, তবু চেষ্টা করে। এই চেষ্টা করার মানসিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন স্বাদ গ্রহণ করতে শেখার মধ্য দিয়ে শিশুরা আসলে নতুন অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করতে শেখে। এতে তারা আরও খোলামেলা ও আত্মবিশ্বাসী হয়।
আত্মবিশ্বাস ও কৌতূহলের বীজ
ভ্রমণ শিশুদের কৌতূহল বাড়ায়। বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তারা প্রশ্ন করে, আঁকে, গল্প বানায়। বিমানবন্দরের লাইন, টিকিট কাটা, লাগেজ নেওয়া—এসব ছোট ঘটনা তাদের কাছে বড় শেখার সুযোগ।
এভাবেই তারা নিজের ওপর ভরসা করতে শেখে। নতুন জায়গায় গিয়েও নিজেকে সামলাতে পারার অনুভূতিটা তাদের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলে।
অভিভাবকের জন্যও এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ শুধু সন্তানের জন্য নয়, অভিভাবকের জন্যও শিক্ষার জায়গা। এতে তারা আরও বাস্তববাদী হন, ধৈর্য ধরতে শেখেন, আর নিখুঁত পরিকল্পনার বাইরে এসে পরিস্থিতিকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ মানে শুধু বেড়াতে যাওয়া নয়। এটি একটি চলমান শেখার প্রক্রিয়া—যেখানে পরিবার একসঙ্গে বড় হয়। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুদের সঙ্গে ভ্রমণে বের হওয়াই আজকের স্মার্ট অভিভাবকদের সচেতন সিদ্ধান্ত। কারণ শৈশবে দেওয়া এই অভিজ্ঞতাগুলোই একদিন সন্তানের জীবনের শক্ত ভিত হয়ে
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



