
ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : পৌষের শুরুতেই যেন প্রকৃতি নিজের শক্তির জানান দিচ্ছে। শীত নামার স্বাভাবিক সময়ের আগেই হঠাৎ তাপমাত্রা কমে গিয়ে দেশের বড় একটি অংশ কনকনে ঠান্ডার কবলে পড়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা এখন চোখে পড়ার মতো। ভোর থেকে ঘন কুয়াশা, সারাদিন সূর্যের আড়াল আর হিমেল হাওয়ার দাপটে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় তাপমাত্রা নেমে এসেছে এক অঙ্কের ঘরে, যা এ মৌসুমের শুরুতে মানুষের জন্য বাড়তি ভোগান্তি ডেকে এনেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও আশপাশের এলাকায় শীতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। শুক্রবার যশোরে চলতি শীত মৌসুমের সর্বনিম্ন ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। চুয়াডাঙ্গায়ও তাপমাত্রা নেমেছে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রিতে। ভোরের দিকে কুয়াশার কারণে সড়ক-মহাসড়কে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। হেডলাইট জ্বালিয়েও অনেক সময় সামনের রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহন ও যাত্রী চলাচলে। নদীপথেও একই চিত্র। কুয়াশা ঘন হলেই পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের অবস্থা আরো বেশি শোচনীয়। পঞ্চগড়, দিনাজপুর, রংপুরসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে হিমালয় থেকে নেমে আসা ঠান্ডা বাতাস সরাসরি আঘাত হানছে। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় গত কয়েক দিন ধরে টানা শৈত্যপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দিনের বেলাতেও সেখানে স্বস্তি নেই। সূর্য উঠলেও তার তাপ অনুভূত হচ্ছে না। রাত নামলেই ঠান্ডার তীব্রতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। শীতের এই দাপটে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন ছিন্নমূল মানুষ, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া শ্রমজীবীরা। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে অনেকেই ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শীতজনিত অসুস্থতাও বাড়ছে।
রাজধানী ঢাকাও এই শীতের প্রভাব থেকে বাদ পড়েনি। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে ঢাকায় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমছে। শুক্রবার সকালে ঢাকায় মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ, যা ঠান্ডার অনুভূতিকে আরো তীব্র করে তুলেছে। সকাল থেকে কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে নগরীর চারপাশ। কর্মজীবী মানুষ বাধ্য হয়েই শীত উপেক্ষা করে বের হচ্ছেন, তবে ফুটপাতে থাকা হতদরিদ্র মানুষের কষ্ট চোখে পড়ার মতো। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এলাকায় শীতের কাপড়ের দোকান ও ফুটপাথের অস্থায়ী দোকানগুলোতে বাড়তি ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই হঠাৎ শীত বাড়ার পেছনে উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। এই বলয়ের বর্ধিতাংশ বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করায় বাংলাদেশে উত্তর দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করছে। এর ফলে রাতের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং দিনের তাপমাত্রাও খুব একটা বাড়ছে না। আবহাওয়াবিদদের মতে, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমে এলে মানুষের শরীরে শীতের অনুভূতি বেশি হয়। বর্তমানে দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে এই পার্থক্য ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে এসেছে, যা জনজীবনে স্থবিরতা তৈরি করছে।
আগামী কয়েক দিনের পূর্বাভাসেও খুব একটা স্বস্তির খবর নেই। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও নদী অববাহিকা এলাকায় কুয়াশার ঘনত্ব বেশি থাকবে। দিনের বেলায় কোথাও কোথাও কুয়াশা দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তাপমাত্রা সামান্য ওঠানামা করলেও সামগ্রিকভাবে শীতের অনুভূতি কমবে না। বরং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আবারও তাপমাত্রা কমে দুই থেকে তিন দিন তীব্র শীত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শীতের এই আগ্রাসনের প্রভাব পড়ছে পর্যটন খাতেও। উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়ি অঞ্চলে যারা শীত উপভোগ করতে যান, তাদের জন্য একদিকে যেমন বাড়তি আকর্ষণ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত কুয়াশা ও ঠান্ডা ভ্রমণে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনেক পর্যটক নির্ধারিত ভ্রমণসূচি পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, শীত মৌসুমে সাধারণত পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও কুয়াশার কারণে সড়ক ও নৌপথে চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পৌষের শুরুতেই দেশের আবহাওয়া এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে মানুষকে। শীতের এই তীব্রতা যদি আরো কয়েক দিন স্থায়ী হয়, তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, শীতজনিত রোগ থেকে বাঁচতে শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন নিতে এবং কুয়াশাচ্ছন্ন সময়ে সড়ক ও নৌপথে চলাচলে সতর্ক থাকতে। প্রকৃতির এই শীতল রূপ কত দিন স্থায়ী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে আপাতত দেশের মানুষকে প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে আরো কয়েক দিন কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশার সঙ্গে লড়াই করার জন্য।
প্রতিবেদক : ইসলাম রাইসুল



