
ভ্যাটিকান সিটি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ইতালির রাজধানী রোম শহরের বুকের ভেতরেই অবস্থিত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র—ভ্যাটিকান সিটি। আয়তনে পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশ হলেও ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মীয় গুরুত্ব ও শিল্পসম্পদের দিক থেকে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী স্থানগুলোর একটি। মাত্র ৪৪ হেক্টর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই নগররাষ্ট্রটি রোমান ক্যাথলিক চার্চের কেন্দ্র এবং পোপের সরকারি বাসস্থান। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৬০ লাখের বেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী ভ্যাটিকান সিটিতে আসেন, কেউ আসেন বিশ্বাসের টানে, কেউ ইতিহাস ও শিল্পের আকর্ষণে, আবার কেউ নিছক ভ্রমণপিপাসা নিয়ে।
ভ্যাটিকান সিটির ইতিহাস শুরু হয় প্রাচীন রোমান যুগ থেকে। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক সেন্ট পিটারকে খ্রিস্টাব্দ ৬৪ সালে সম্রাট নিরোর শাসনামলে এই এলাকাতেই ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে তার সমাধিস্থলের ওপর নির্মিত হয় সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা। মধ্যযুগে ধীরে ধীরে এই অঞ্চলটি পোপদের আবাসস্থলে পরিণত হয়। ১৯২৯ সালে ইতালি সরকারের সঙ্গে “ল্যাটেরান চুক্তি” স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভ্যাটিকান সিটি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। যদিও এটি জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য নয়, তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
ভ্যাটিকান সিটির ঐতিহ্য মূলত ধর্ম, শিল্প ও জ্ঞানচর্চাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এখানকার প্রতিটি ইট, প্রতিটি ভাস্কর্য, প্রতিটি চিত্রকর্ম কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস বহন করে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গির্জাগুলোর একটি সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি রেনেসাঁ স্থাপত্যের এক জীবন্ত দলিল। মাইকেলেঞ্জেলোর নকশায় নির্মিত বিশাল গম্বুজ, বার্নিনির অলংকৃত বেদি এবং সেন্ট পিটারের সমাধি—সব মিলিয়ে এটি দর্শনার্থীদের অভিভূত করে। গির্জার ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে অসংখ্য চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য, যার মধ্যে মাইকেলেঞ্জেলোর “পিয়েতা” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ভ্যাটিকান মিউজিয়াম পর্যটকদের জন্য আরেকটি প্রধান আকর্ষণ। এটি আসলে কয়েকটি জাদুঘরের সমষ্টি, যেখানে প্রায় ৭০ হাজারের বেশি শিল্পকর্ম সংরক্ষিত আছে। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ভাস্কর্য, মিসরীয় নিদর্শন, রেনেসাঁ চিত্রকলা—সবই এখানে এক ছাদের নিচে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ হলো সিস্টিন চ্যাপেল। মাইকেলেঞ্জেলোর আঁকা ছাদের ফ্রেস্কো “দ্য ক্রিয়েশন অব অ্যাডাম” পৃথিবীর অন্যতম পরিচিত শিল্পকর্ম। চ্যাপেলের ভেতরে ছবি তোলা নিষিদ্ধ এবং নীরবতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক, যা পুরো অভিজ্ঞতাকে আরও গম্ভীর ও শ্রদ্ধাময় করে তোলে।
সংস্কৃতির দিক থেকে ভ্যাটিকান সিটি একটি অনন্য স্থান। এখানে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান, প্রার্থনা কিংবা রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হয়। রবিবার পোপের নেতৃত্বে সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে অনুষ্ঠিত প্রার্থনায় হাজারো মানুষ অংশ নেন। বড়দিন, ইস্টারসহ খ্রিস্টান ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোতে ভ্যাটিকান সিটি যেন এক ভিন্ন রূপ নেয়। সুইস গার্ড নামে পরিচিত ভ্যাটিকানের ঐতিহ্যবাহী নিরাপত্তা বাহিনী তাদের রঙিন পোশাক ও শতাব্দীপ্রাচীন রীতিনীতির মাধ্যমে দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বলতে গেলে, ভ্যাটিকান সিটি মূলত স্থাপত্যনির্ভর হলেও এখানকার বাগানগুলো সত্যিই মনোমুগ্ধকর। ভ্যাটিকান গার্ডেনস দেশের প্রায় অর্ধেক জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। সবুজ লন, ফুলের বাগান, ঝরনা ও ছোট ছোট বনভূমি এই জায়গাটিকে এক শান্ত পরিবেশে রূপ দিয়েছে। নির্দিষ্ট ট্যুরের মাধ্যমে এসব বাগান ঘুরে দেখা যায়, যেখানে প্রকৃতি আর ধর্মীয় স্থাপত্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়।
ভ্যাটিকান সিটিতে প্রবেশ করতে আলাদা কোনো ভিসা লাগে না। যেহেতু এটি ইতালির ভেতরে অবস্থিত, তাই ইতালির শেনজেন ভিসা থাকলেই পর্যটকরা সহজেই এখানে প্রবেশ করতে পারেন। রোম শহর থেকে যাতায়াত অত্যন্ত সহজ। রোমের মেট্রো লাইনের Ottaviano বা Cipro স্টেশনে নামলেই হেঁটে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভ্যাটিকান সিটিতে পৌঁছানো যায়। বাস ও ট্রাম সার্ভিসও নিয়মিত চলাচল করে।
খরচের দিক থেকে ভ্যাটিকান সিটি তুলনামূলকভাবে মাঝারি পর্যায়ের। সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় প্রবেশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, তবে গম্বুজে ওঠার জন্য লিফট ব্যবহার করলে প্রায় ৮–১০ ইউরো এবং হেঁটে উঠলে কিছুটা কম খরচ পড়ে। ভ্যাটিকান মিউজিয়ামের টিকিট সাধারণত ১৭–২০ ইউরোর মধ্যে, অনলাইন বুকিং করলে লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলা এড়ানো যায়। গাইডেড ট্যুর নিলে খরচ আরও কিছুটা বাড়ে, তবে ইতিহাস ও শিল্প সম্পর্কে গভীর ধারণা পাওয়া যায়।
ভ্যাটিকান সিটির ভেতরে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই সাধারণ পর্যটকদের জন্য। তবে আশপাশের রোম শহরে সব ধরনের থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যায়। বাজেট হোস্টেল থেকে শুরু করে বিলাসবহুল পাঁচ তারকা হোটেল—সবই রয়েছে ভ্যাটিকানের আশপাশে। ভ্যাটিকানের কাছে থাকার সুবিধা হলো, সকালে খুব সহজে প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখা যায়। খাবারের ক্ষেত্রেও রোম পর্যটকদের জন্য স্বর্গসম। ইতালিয়ান পিজ্জা, পাস্তা, জেলাতোসহ নানা ধরনের খাবার ভ্যাটিকানের আশপাশে সহজেই পাওয়া যায়।
ভ্রমণের সময় কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি। ভ্যাটিকান একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হওয়ায় পোশাকের বিষয়ে কড়াকড়ি আছে। শর্টস, হাতকাটা জামা বা খুব ছোট পোশাক পরে গির্জা বা জাদুঘরে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ। নিরাপত্তা চেকিং বেশ কড়া, তাই বড় ব্যাগ বা নিষিদ্ধ সামগ্রী সঙ্গে না নেওয়াই ভালো। গ্রীষ্মকালে পর্যটকের চাপ বেশি থাকে, তাই বসন্ত বা শরৎকাল ভ্রমণের জন্য তুলনামূলকভাবে ভালো সময়।
সব মিলিয়ে ভ্যাটিকান সিটি শুধু একটি দেশ নয়, এটি মানবসভ্যতার ইতিহাস, বিশ্বাস, শিল্প ও সংস্কৃতির এক অনন্য সংমিশ্রণ। যারা ইউরোপ ভ্রমণে আসেন, তাদের জন্য ভ্যাটিকান সিটি দেখা মানে পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে কাছ থেকে অনুভব করা। ছোট্ট এই রাষ্ট্রটি প্রমাণ করে, আয়তন নয়—গভীরতা আর প্রভাবই একটি জায়গাকে মহান করে তোলে।



