
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : কলকাতা ও শিলিগুড়ির হোটেল শিল্পে বাংলাদেশি পর্যটকদের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অবশেষে তুলে নেওয়া হয়েছে, যা উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতির একটি ইতিবাচক সংকেত। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ গ্রেটার শিলিগুড়ি হোটেলিয়ার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (জিএসএইচডব্লিউএ) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে, শিলিগুড়ি ও আশপাশের এলাকার সদস্য হোটেলগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের থাকার সুবিধা পুনরায় চালু করা হচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞা ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছিল এবং প্রায় ১৩ মাস ধরে চলেছিল। কলকাতায় যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক অ্যাসোসিয়েশন-স্তরের নিষেধাজ্ঞা ছিল না, তবে অনেক হোটেল মালিক অনানুষ্ঠানিকভাবে একই নীতি অনুসরণ করেছিলেন, যার ফলে শহরের পর্যটন-নির্ভর ব্যবসা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা। এ সময় হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতনের অভিযোগ, ভারতীয় জাতীয় পতাকার অসম্মান এবং ভারত-বিরোধী মনোভাবের ঘটনা ঘটে। এসবের প্রতিক্রিয়ায় শিলিগুড়ির হোটেল মালিকরা বাংলাদেশি পর্যটকদের হোটেলে থাকতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে সাধারণ পর্যটকদের জন্য হলেও পরে চিকিত্সা ও শিক্ষা ভিসাধারীদের ক্ষেত্রেও এটি প্রসারিত হয়। কলকাতায় ভিসা সেন্টার বন্ধ হওয়া এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে পর্যটকদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক হোটেল একই পথ অনুসরণ করে।
এই নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল অত্যন্ত গুরুতর। শিলিগুড়িতে প্রতি মাসে গড়ে ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ বাংলাদেশি পর্যটক আসতেন, যাদের অধিকাংশই চিকিত্সা, শিক্ষা এবং পর্যটনের উদ্দেশ্যে আসতেন। নিষেধাজ্ঞার পর এই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। জিএসএইচডব্লিউএ-এর যুগ্ম সচিব উজ্জ্বল ঘোষ জানিয়েছেন যে, অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হোটেলগুলো মাসিক প্রায় ১০ লক্ষ রুপি করে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, যা ১৩ মাসে মোট ১.৩০ কোটি রুপিরও বেশি। কিছু সূত্র অনুসারে এই ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি রুপির কাছাকাছি পৌঁছেছে। হোটেলের অকুপেন্সি রেট ৫০% পর্যন্ত কমে যায়, যার ফলে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসা যেমন রেস্তোরাঁ, দোকান এবং পরিবহনও প্রভাবিত হয়।
কলকাতায় পরিস্থিতি আরও জটিল ছিল। শহরের ‘মিনি বাংলাদেশ’ বলে পরিচিত এলাকাগুলোতে (যেমন মার্কুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট) বাংলাদেশি পর্যটকদের অনুপস্থিতিতে হোটেলের আয় ৬০% পর্যন্ত কমে যায়। প্রায় ৪০% রেস্তোরাঁ ও দোকান বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশি পর্যটকরা প্রতি বছর কলকাতায় কোটি কোটি রুপি ব্যয় করতেন, যা স্থানীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ ছিল। প্যান্ডেমিকের পর এই ক্ষতি আরও তীব্র হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পিছনে মূল কারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ফিরে আসা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করে এবং তারিক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন। নতুন সরকারের অধীনে ভারত-বিরোধী বক্তব্য কমে যায় এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সীমান্ত ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়। শিলিগুড়ির অ্যাসোসিয়েশন অনলাইন ভোটিংয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়, যেখানে ৭৫% এর বেশি সদস্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পক্ষে ভোট দেন। উজ্জ্বল ঘোষ বলেন, “বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার গঠনের পর এবং ইতিবাচক কূটনৈতিক পরিবর্তন দেখে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তবে অ্যাসোসিয়েশন সতর্ক করে দিয়েছে যে, ভবিষ্যতে কোনো ভারত-বিরোধী ঘটনা ঘটলে নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করা হতে পারে।
কলকাতায়ও এই সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশি পর্যটকদের ফিরে আসার সাথে সাথে হোটেল ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় পুনরুজ্জীবনের আশা জাগছে। এই ঘটনা দেখিয়েছে যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা কীভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতি করে এবং সম্পর্কের উন্নতি কীভাবে তা পূরণ করতে পারে। উভয় দেশের নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি স্বস্তির খবর, যা ভবিষ্যতে আরও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের পথ প্রশস্ত করবে।
প্রতিবেদক : অংকুশ দেব



