বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মুখে বাংলাদেশের বিমান চলাচল

বিমানবন্দর

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাত এখন এক কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে। নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা, লাইসেন্সিং অনিয়ম এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উদ্বেগ’ ঘোষণা করতে পারে, যা কার্যত বৈশ্বিক কালো তালিকাভুক্তির শামিল।

এভিয়েশন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ কার্যকর হওয়ার পর নিয়ন্ত্রক কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB) দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারত, সেখানে এখন একাধিক প্রশাসনিক ধাপ ও মন্ত্রণালয়নির্ভর অনুমোদন প্রক্রিয়া সময়মতো আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে বাধা সৃষ্টি করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ICAO-এর নির্ধারিত নিরাপত্তা মান বাস্তবায়নে।

সিএএবির অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন আইনি কাঠামো নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে। এর ফলে জরুরি নিরাপত্তা বিধিমালা সংশোধন কিংবা নতুন নির্দেশনা জারি করতে অযথা বিলম্ব হচ্ছে। বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, শিকাগো কনভেনশনের মূল চেতনা হলো স্বাধীন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা। সেই জায়গায় ঘাটতি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

সিএএবির সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের জন্য এর পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ শুধু ICAO অডিটেই প্রভাব ফেলবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) থেকে ক্যাটাগরি-১ মর্যাদা অর্জনের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ ও বৈশ্বিক সহযোগিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

এই সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো লাইসেন্সিং ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা। অভিযোগ রয়েছে, সিএএবির অধীনে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টর (FOI) বৈধ ও হালনাগাদ এয়ার ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স (ATPL) ছাড়াই কাজ করছেন। ICAO-এর নিয়ম অনুযায়ী, পাইলট লাইসেন্স প্রদান ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিজস্ব লাইসেন্স, টাইপ রেটিং এবং পূর্ণ অপারেশনাল দক্ষতা থাকা বাধ্যতামূলক। বাস্তবে তার ব্যত্যয় ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বৈধ লাইসেন্সবিহীন পরিদর্শকদের মাধ্যমে পাইলটদের দক্ষতা মূল্যায়ন, সিমুলেটর পরীক্ষা বা প্রশিক্ষণ অনুমোদন পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। আন্তর্জাতিক অডিটের সময় এসব তদারকি অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হলে বাংলাদেশের সম্মতি অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

যোগ্যতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ কম নয়। আইসিএও নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন FOI হতে হলে নির্দিষ্ট পরিমাণ কমান্ড ফ্লাইট ঘণ্টার অভিজ্ঞতা থাকা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে কিছু কর্মকর্তার সেই অভিজ্ঞতা নেই বলেই সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এমনকি অতীতে চিকিৎসাগত বা প্রশিক্ষণ ব্যর্থতার কারণে যাদের উড়োজাহাজ পরিচালনা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তারাও নাকি এখন বিমান সংস্থা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় যুক্ত।

নিয়ন্ত্রক দুর্বলতার পাশাপাশি ফ্লাইট পরিচালনায় অতিরিক্ত চাপের চিত্রও সামনে এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশন (FDTL) লঙ্ঘনের অভিযোগ গুরুতর আকার নিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, একজন বাণিজ্যিক পাইলট বছরে সর্বোচ্চ এক হাজার ঘণ্টা ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এই সীমা অতিক্রম করে পাইলটদের ১,২০০ থেকে ১,৪০০ ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।

পাইলটদের দাবি, অতিরিক্ত ফ্লাইট সময় নিয়ে শত শত নিরাপত্তা প্রতিবেদন জমা পড়লেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উল্টো কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়ভীতি ও পেশাগত চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান—হৃদরোগ, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া এবং শারীরিক জটিলতার ঘটনা বাড়ছে, যা সরাসরি ফ্লাইট নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব অনিয়ম একত্রে ICAO-এর সমন্বিত যাচাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। যদি ‘গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উদ্বেগ’ ঘোষণা করা হয়, তাহলে দেশের বিমান সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক রুট, কোড-শেয়ার চুক্তি এবং নতুন বাজারে প্রবেশ কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি FAA, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (EASA) এবং আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (IATA) থেকেও নেতিবাচক মূল্যায়নের ঝুঁকি তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বক্তব্য, এখনই কঠোর ও স্বচ্ছ সংস্কার না আনলে ক্ষতি শুধু বিমান চলাচল খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি দেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী লাইসেন্সিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং ফ্লাইট নিরাপত্তায় শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণই পারে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ।

Read Previous

বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ভারতের মাটিতে খেলতে না যাওয়ায় ভারতের ক্রীড়া পর্যটন: লাভ না ক্ষতি—বাস্তব চিত্র

Read Next

উপদেষ্টার দায়িত্বে থেকেও এভিয়েশন ব্যবসার উদ্যোগ: শেখ বশিরউদ্দিনকে ঘিরে স্বার্থসংঘাতের বিতর্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular