
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে পর্যটক প্রবাহ বাড়াতে বাংলাদেশের ট্যুর অপারেটররা শ্রীলঙ্কা সরকারের প্রতি বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য আগমনকালীন (অন-অ্যারাইভাল) ভিসা ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তারা আরও প্রতিযোগিতামূলক ও সাশ্রয়ী পর্যটন প্যাকেজ চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে সাধারণ বাংলাদেশি ভ্রমণপিপাসুরা সহজেই শ্রীলঙ্কার সুন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।
রবিবার ঢাকায় শ্রীলঙ্কা পর্যটন উন্নয়ন ব্যুরো (এসএলটিপিবি) আয়োজিত এক গণমাধ্যম নেটওয়ার্কিং অধিবেশনে এই আবেদন উত্থাপিত হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার পর্যটন খাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত শ্রীলঙ্কার হাই কমিশনার ধর্মপালবীরক্কোডি (ধর্মপাল ভীরক্কোডি) সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এসএলটিপিবি চেয়ারম্যান বুদ্ধিকা হেওয়াওয়াসাম এবং বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (টিওএবি) সভাপতি মোহাম্মদ রফিউজ্জামান।
অধিবেশনে বক্তারা জানান, বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় প্রবেশের জন্য বাংলাদেশিদের ইলেকট্রনিক ট্র্যাভেল অথরাইজেশন (ইটিএ) আগেই সংগ্রহ করতে হয়। অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা থাকলেও তাতে ২৫ থেকে ৩০ ডলারের মতো ফি দিতে হয়, যা অনেক সম্ভাব্য পর্যটকের কাছে অতিরিক্তআর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের নেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, “সার্কভুক্ত দেশগুলোতে এই ধরনের ভিসা ফি পর্যটকদের ভ্রমণ সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফি মওকুফ করা হলে বাংলাদেশ থেকে শ্রীলঙ্কায় পর্যটক প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা তার পর্যটন নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে তারা পূর্বের নমনীয় অন-অ্যারাইভাল ভিসা ব্যবস্থা থেকে সরে এসে আগাম অনুমোদনের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। এতে প্রক্রিয়াকরণ খরচ বাড়লেও পর্যটকদের সুবিধা কমেছে বলে অনেকে মনে করেন। বাংলাদেশি অপারেটররা মনে করেন, এই সময়ে ফি মওকুফ করলে শ্রীলঙ্কা দ্রুত তার হারানো গতি ফিরে পেতে পারে।
শ্রীলঙ্কার হাই কমিশনার ধর্মপাল বীরক্কোডি বলেন, “বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে পর্যটন সহযোগিতা দুই দেশের জন্যই মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। আমরা বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য আরও সহজ ও আকর্ষণীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।” তিনি দুই দেশের মধ্যে বিমান সংযোগ বৃদ্ধি, সরাসরি ফ্লাইট চালু এবং যৌথ প্রচারণার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
এসএলটিপিবি চেয়ারম্যান বুদ্ধিকা হেওয়াওয়াসাম উপস্থাপনার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন পর্যটন আকর্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শ্রীলঙ্কা বর্তমানে নিজেকে একটি নিরাপদ, পরিবারবান্ধব ও বৈচিত্র্যময় গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। দেশটির সোনালি সমুদ্রসৈকত, প্রাচীন মন্দির-স্তূপ, চা বাগান, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং বিলাসবহুল রিসোর্টগুলো বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য আদর্শ। তিনি জানান, বাংলাদেশি অতিথিদের জন্য বিশেষ ছাড়সহ প্যাকেজ তৈরি করা হচ্ছে এবং সেবার মান আরও উন্নত করার প্রচেষ্টা চলছে।
টিওএবি সভাপতি মোহাম্মদ রফিউজ্জামান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “এ ধরনের নেটওয়ার্কিং অধিবেশন পর্যটন খাতের অংশীজনদের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করবে। ভিসা সহজীকরণ এবং প্যাকেজের সাশ্রয়ীকরণ হলে বাংলাদেশ থেকে শ্রীলঙ্কায় বার্ষিক পর্যটক সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়তে পারে।” তিনি বিমানভাড়া কমানো, সরাসরি ফ্লাইট বৃদ্ধি এবং ভ্রমণ-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নেরও দাবি জানান।
অধিবেশনে অংশগ্রহণকারীরা আরও আলোচনা করেন যে, শ্রীলঙ্কা তার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে পর্যটন খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা সরকার ৪০টি দেশের জন্য বিনামূল্যে বা ফি মওকুফের ভিসা প্রোগ্রাম চালু করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে তা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একই দিন ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে পর্যটন বাণিজ্য অংশীদারদের জন্য বিশেষ বিজনেস-টু-বিজনেস (বি২বি) রোডশো ও নেটওয়ার্কিং সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ১৫০ জন বাংলাদেশি ট্রাভেল এজেন্ট ও ট্যুর অপারেটর অংশ নেন। সেখানে শ্রীলঙ্কার হোটেল, ট্যুর অপারেটর এবং এয়ারলাইনস প্রতিনিধিরা তাদের সেবা ও প্যাকেজ উপস্থাপন করেন।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এ ধরনের উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক পর্যটনকে উৎসাহিত করবে। বাংলাদেশ থেকে শ্রীলঙ্কায় ভ্রমণ বাড়লে শুধু অর্থনৈতিক লাভই নয়, দুই দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশি পর্যটকরা শ্রীলঙ্কার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থান ও উষ্ণ অতিথিপরায়ণতা উপভোগ করে ফিরে আসেন বলে জানা যায়।
এই আহ্বানের প্রতি শ্রীলঙ্কা সরকার ইতিবাচক সাড়া দিলে আগামী মাসগুলোতে দুই দেশের মধ্যে পর্যটন খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, ভিসা সহজীকরণ এবং যৌথ প্রচারণার মাধ্যমে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে শ্রীলঙ্কায় পর্যটক সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।



