
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড় এখন রঙিন সাজে সেজে উঠেছে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বৈসাবি উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে। চাকমা সম্প্রদায়ের ‘বিজু’, ত্রিপুরাদের ‘বৈসুক’ এবং মারমাদের ‘সাংগ্রাই’—এই তিন উৎসবের আদ্যক্ষর মিলিয়ে গড়ে ওঠা বৈসাবি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসব। ২০২৬ সালের চৈত্র সংক্রান্তি ১৩ এপ্রিল (সোমবার) পড়ায় আগামী ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে ফুল বিজু, তারপর মূল বিজু ও গজ্যাপজ্যা। পাহাড়ি পল্লী থেকে শুরু করে জেলা শহরের প্রতিটি কোণায় এখন সাজ সাজ রব। জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। নিরাপত্তা সমন্বয় সভা থেকে শুরু করে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা—সবকিছু নিয়ে উৎসবের প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে।
খাগড়াছড়িতে পানছড়ি উপজেলাসহ প্রত্যন্ত পাহাড়ি পল্লীগুলোতে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। সেনাবাহিনীর ২০৩ পদাতিক ব্রিগেডের উদ্যোগে নিরাপত্তা বিষয়ক সমন্বয় সভা হয়েছে। সভায় জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সেনা কর্মকর্তা এবং পাহাড়ি নেতৃত্ব অংশ নিয়ে উৎসব নির্বিঘ্ন করার পরিকল্পনা করেছেন। চেঙ্গি নদীতে ১২ এপ্রিল ফুল ভাসানোর আয়োজন, ১৩ এপ্রিল ঘরে ঘরে পাঁচন রান্না ও অতিথি আপ্যায়ন, ১৪ এপ্রিল জলকেলি—এসব কর্মসূচি ঘিরে পুরো এলাকায় উৎসবের আমেজ। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের উদ্যোগে শুরু হয়েছে বৈসাবি মেলা। মেলা প্রাঙ্গণে পাহাড়ি নারীদের হাতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী পোশাক, গহনা, হস্তশিল্পের সমাহার। পিনোন-হাদি, থামি, রিনাই-রিসা, ব্লক করা গেঞ্জি, পাঞ্জাবি—সবকিছুর চাহিদা আকাশছোঁয়া।
রাঙামাটি ও বান্দরবানেও একই চিত্র। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীরসাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে সাতদিনব্যাপী বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক-বিষু মেলা চলছে। শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, চাকমা ভাষা ও বর্ণমালা লেখা প্রতিযোগিতা, ঘিলা খেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে পাহাড় জুড়ে প্রাণের উচ্ছ্বাস। বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদেও ঘরে ঘরে চলছে সাজসজ্জা। রাস্তার দু’পাশে রঙিন ব্যানার, বাঁশের তোরণ, ফুলের মালায় সাজানো হয়েছে বাড়িঘর। হাটবাজারে ভিড় বেড়েছে। পাঁচন তৈরির উপকরণ—বাঁশকোড়ল, তারা, পাহাড়ি আলু, বুনো সবজি, শুকনো মাছ (সিদল)—কিনতে মানুষের ঢল। পাহাড়ি খাবারের মধ্যে পাঁচনের বিশেষত্ব অসাধারণ। ৩০-৪০ প্রকার সবজি, মাছ-মাংস মিশিয়ে তৈরি এই তরকারি আগামী বছরের অসুস্থতা দূর করবে বলে বিশ্বাস। সঙ্গে বিন্নি ধানের খই, নাড়ু, সেমাই এবং পাহাড়ি মদও পরিবেশিত হয় অতিথিদের জন্য।
উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষক দিক হলো পাহাড়ি নারীদের কোমর তাঁতে কাপড় বোনার ব্যস্ততা। বৈসাবিকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের প্রতিটি ঘরে এখন তাঁতের শব্দ। কোমর তাঁত—পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁত। নারীরা নিজের কোমরে বাঁশ-কাঠের কাঠি বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে বুনছেন রঙিন পিনোন-হাদি, থামি-ওড়না। চাহিদা বেড়েছে বলে দিনরাত কাজ চলছে। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটির প্রত্যন্ত পল্লীতে তরুণীরা এখন তাঁতের সামনে বসে। একেকটি সেট তৈরি করতে সময় লাগে দিনের পর দিন। কিন্তু উৎসবের আনন্দে সেই পরিশ্রমও আনন্দময়। পাহাড়ি নারীরা বলছেন, “বৈসাবিতে নতুন কাপড় না পরলে উৎসব যেন পূর্ণ হয় না।” এই তাঁতশিল্প শুধু ঐতিহ্য নয়, তাদের আয়েরও প্রধান উৎস। অনেকে সুতা নিয়ে অন্যের হয়ে বুনে পারিশ্রমিক নেন। উৎসবের সময় এই আয়ও বাড়ে কয়েকগুণ।
পর্যটকদের ভিড়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত—ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী থেকে হাজার হাজার পর্যটক আসছেন পাহাড়ে বৈসাবি দেখতে। রিসোর্ট, হোটেল, গেস্টহাউসে আগাম বুকিং শুরু হয়েছে। খাগড়াছড়ির আলুটিলা, চেঙ্গি নদীতীর, রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ, বান্দরবানের নীলগিরি—সব জায়গায় পর্যটকদের পদচারণা। স্থানীয়রা বলছেন, এবারের উৎসবে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা গত বছরের চেয়ে বেশি হবে বলে আশা। নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি মিলে টহল বাড়িয়েছে। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি। পর্যটকরা শুধু উৎসব দেখতে নয়, পাহাড়ি সংস্কৃতি, নাচ-গান, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা উপভোগ করতে আসছেন। ঘিলা খেলা, বলি খেলা, নাচের আসরে পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ছে।
এই উৎসব শুধু আনন্দের নয়, সম্প্রীতিরও প্রতীক। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, পাংখোয়া, লুসাই—সব সম্প্রদায় একসঙ্গে উদযাপন করে। পুরনো বছরকে বিদায় আর নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়েতারা একতার বার্তা দেয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ঢাকায়ও বর্ণাঢ্য বৈসাবি উৎসবের আয়োজন করছে। কিন্তু পাহাড়ের আসল রূপ দেখতে পর্যটকরা ছুটে আসছেন এখানেই। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। বাস, জিপ, মোটরসাইকেলে করে পর্যটকরা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিচ্ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎসবের সময় বিক্রি বেড়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি।
তবে উৎসবের মাঝে পরিবেশ রক্ষারও আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় নেতৃত্ব। নদীতে ফুল ভাসানোর সময় প্লাস্টিক বর্জ্য যেন না ফেলা হয়, সেদিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। পাহাড়ি যুবকরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন। শিশু-কিশোরদের নিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মসূচি চলছে। বৈসাবি শুধু একটি উৎসব নয়, পাহাড়ি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সম্প্রদায়ের বন্ধনকে আরও মজবুত করে।
এবারের বৈসাবিতে পাহাড়ের সবুজ পাহাড় আর রঙিন পোশাকের মিলনে যে ছবি তৈরি হচ্ছে, তা সারা দেশের মানুষের কাছে সম্প্রীতির উদাহরণ হয়ে উঠবে। পর্যটকরা যখন ফিরে যাবেন, সঙ্গে নিয়ে যাবেন পাহাড়ের আন্তরিকতা ও উষ্ণতা। আর পাহাড়ি নারী-পুরুষরা নতুন বছরে নতুন আশা নিয়ে এগিয়ে যাবেন। বৈসাবি উৎসবের এই প্রস্তুতি শুধু উৎসবের নয়, একটি জাতিগোষ্ঠীর জীবনধারারও উদযাপন। পাহাড় এখন অপেক্ষায়—১২ এপ্রিলের ফুল ভাসানোর জন্য, নতুন বছরের নতুন সূর্যোদয়ের জন্য।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



