১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঈদের দুই দিনে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে, নিহত ২৯ জন; আহত শতাধিক

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দময় দিনগুলোতে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ঈদের প্রথম দিন শনিবার (২১ মার্চ ২০২৬) থেকে দ্বিতীয় দিন রবিবার (২২ মার্চ) পর্যন্ত মাত্র দুই দিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ২৯ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন শতাধিক। ঈদের ছুটিতে ঘরে ফেরা ও বেড়ানোর উৎসাহে মানুষের অসতর্কতা, অতিরিক্ত গতি এবং যানবাহনের অযথা চাপ এই দুর্ঘটনাগুলোর মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ দিনের তুলনায় এই সময়ে দুর্ঘটনার হার কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

ঈদের প্রথম দিনেই আট জেলায় ছড়িয়ে পড়া দুর্ঘটনায় ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, আহত হয়েছেন ২৫ থেকে ২৬ জন। ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা সড়কের কাশিগঞ্জ বাজার এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন নেত্রকোনার রুবেল মিয়া (২০) ও ময়মনসিংহের রিতি আক্তার (৮)। একই দিনে চট্টগ্রামের পটিয়ায় ঢাকা-কক্সবাজার বাইপাস সড়কে হানিফ পরিবহনের একটি বাস পথচারী বাঁচাতে গিয়ে ডিভাইডারে ধাক্কা খেয়ে উল্টে যায়। এতে ৩৫ বছরের আবুল কাশেমসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। মিরসরাইয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি প্রাইভেট কার গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে কুমিল্লার এনামুল হক নিহত হন।

নড়াইলে মাগুরা-নড়াইল আঞ্চলিক সড়কে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাব্বি মোল্লা (২০) মারা যান। ঝিনাইদহে জেনিদাহ-চুয়াডাঙ্গা সড়কে নাসিম মোটররিকশা থেকে পড়ে স্কুলছাত্র আবদুল গফুর (১৪) প্রাণ হারান। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় বৃষ্টিতে পিচ্ছিল সড়কে মোটরসাইকেল হারিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জিহাদ শেখ (১৬) নিহত হন। মাদারীপুরে এক্সপ্রেসওয়েতে ভ্যান ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে স্কুলছাত্র শাহাদাত খলিফা (১৫) মারা যান। চুয়াডাঙ্গায় মোটরসাইকেল গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সুরুজ (১৮) নিহত এবং হৃদয় আহত হন। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শরিফুল ইসলাম (৩০) প্রাণ হারান। এসব ঘটনায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস দ্রুত সাড়া দিয়ে উদ্ধারকাজ চালায়, কিন্তু দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে অতিরিক্ত গতি, অসতর্কতা ও মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচলকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঈদের দ্বিতীয় দিন রবিবার সকাল থেকে দুর্ঘটনার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তিন জেলায় তিনটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত হন, আহত হন অন্তত ৩০ জন। কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার জাঙ্গালিয়া কাচুয়া এলাকায় লেভেল ক্রসিংয়ে চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনের সঙ্গে মামুন পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষ হয়। বাসটি পুরোপুরি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এতে ৭ পুরুষ, ৩ নারী ও ২ শিশুসহ ১২ জন নিহত হন এবং ২০ জন আহত হন। রেলমন্ত্রণালয় থেকে নিহত প্রত্যেক পরিবারকে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার এসআই সাইফুল ইসলাম জানান, ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশ দ্রুত উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করে।

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার আন্দিউড়া এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে একটি ডিআই পিকআপ ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের গভীর খাদে পড়ে যায়। অজ্ঞাত একটি গাড়ির ধাক্কায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ৪ জন নিহত হন। মাধবপুর থানার ওসি মো. সোহেল রানা জানান, মৃতদেহ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। ফেনীর রামপুর ব্রিজ এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সড়ক মেরামতের কাজের জন্য লেন সংকুচিত হওয়ায় যানজট সৃষ্টি হয়। শামলী পরিবহনের একটি বাস ধীরগতির অ্যাম্বুলেন্সে ধাক্কা দেয়। এ নিয়ে দুই চালকের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হলে দোয়েল পরিবহনের আরেকটি বাস জ্যামে ঢুকে পড়ে এবং একটি মোটরসাইকেলও জড়িয়ে পড়ে। এ ত্রিমুখী সংঘর্ষে বাস সুপারভাইজার, এক যাত্রী ও মোটরসাইকেল আরোহীসহ ৩ জন নিহত এবং ৫ জন গুরুতর আহত হন। মহিপাল হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ আসাদুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে রাস্তা মেরামত ও অতিরিক্ত গতিকে দায়ী করা হয়েছে।

এই দুই দিনের দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল, বাস, পিকআপ ও ট্রেনের সংঘর্ষই প্রধান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদের সময় সড়কে যানবাহনের চাপ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। অনেকে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালিয়ে বা ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালান। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুসারে, গত কয়েক বছরে প্রতি ঈদে শতাধিক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এবারও ঈদের ছুটিতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি দেখা গেছে, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঈদের ছুটিতে দৈনিক গড়ে ২২ জনের মৃত্যু হয়। এবারের এই হার আরও বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

দুর্ঘটনার পেছনে সড়কের অবস্থা, আলোর অভাব, লেভেল ক্রসিংয়ে অসতর্কতা এবং ট্রাফিক আইনের অপ্রতুল প্রয়োগও দায়ী। অনেক ক্ষেত্রে ঈদের দিনে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়াতে বের হয়ে অথবা বাড়ি ফেরার পথে এসব ঘটনা ঘটছে। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে যে, অনেক চালক ঈদের আনন্দে সতর্কতা হারিয়ে ফেলেন। সরকারের পক্ষ থেকে হাইওয়ে পুলিশকে বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু পুলিশি তৎপরতা নয়, সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন, লেভেল ক্রসিংয়ে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

ঈদের এই দুই দিনের ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে, উৎসবের আনন্দ যেন মৃত্যুর মিছিলে পরিণত না হয়। নিহতদের পরিবারগুলোতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকে ঈদের নতুন জামা পরে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। চালকদের প্রতি আহ্বান, গতি সীমা মেনে চলুন, বিশ্রাম নিন এবং যাত্রীদেরও সতর্ক থাকুন। শুধু একটি সচেতন সিদ্ধান্তই অনেক প্রাণ বাঁচাতে পারে।

সার্বিকভাবে, এই দুই দিনের দুর্ঘটনা সড়ক নিরাপত্তার দুর্বলতা তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। ঈদের আনন্দ যেন কোনো পরিবারের জন্য শোকে পরিণত না হয়—এটাই সবার প্রত্যাশা।

Read Previous

ঈদুল ফিতরের দ্বিতীয় দিনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়

Read Next

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত অবৈধ স্থাপনামুক্ত হচ্ছে: পর্যটকরা কবে পাবেন পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর সৈকত?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular