
শশী লজ, ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাসে সমৃদ্ধ ময়মনসিংহ জেলা। শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, নদী, বন, প্রত্নস্থল, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য সমন্বয় এই অঞ্চলে বিদ্যমান। তবুও সম্ভাবনার তুলনায় পর্যটনশিল্পের অগ্রগতি এখানে হতাশাজনক। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনার অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং কার্যকর প্রচারের ঘাটতিই এই খাতের বিকাশে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলা শহরসহ আশপাশের উপজেলাগুলোতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। প্রাচীন জমিদারবাড়ি, ঐতিহাসিক স্থাপনা, নদীতীর, উদ্যান, বনাঞ্চল ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপন করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এটি হতে পারত একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বেশির ভাগ স্থানে নেই পর্যাপ্ত যাতায়াত ব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র, গাইড বা পর্যটকবান্ধব সুযোগ-সুবিধা। ফলে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অনেক পর্যটক এখানে আসতে নিরুৎসাহিত হন।
এই জেলায় সরকারি স্বীকৃত সংরক্ষিত পুরাকীর্তির সংখ্যা একাধিক। কিন্তু সেগুলোর ইতিহাস, গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রায় অজানা। অনেক স্থানে তথ্যফলক নেই, কোথাও নেই রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা। নান্দনিক উপস্থাপন, আলোকসজ্জা, প্রদর্শনী বা ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা থাকলে এসব স্থাপনাই পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারত। বাস্তবে তা না হওয়ায় ঐতিহ্যগুলো ধীরে ধীরে মানুষের দৃষ্টি থেকে আড়ালে চলে যাচ্ছে।
পর্যটন কেবল স্থাপনা দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত খাদ্য, লোকসংস্কৃতি, সংগীত, নাট্যধারা ও স্থানীয় উৎসব। ময়মনসিংহ অঞ্চলের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ হলেও সেগুলোর নিয়মিত উপস্থাপন নেই। লোকজ পালাগান, নাট্যরূপ বা ঐতিহ্যবাহী আয়োজন নিয়মিত হলে পর্যটকের সংখ্যা বহুগুণ বাড়তে পারত। অথচ এসব উদ্যোগ নেওয়ার মতো সমন্বিত পরিকল্পনা চোখে পড়ে না।
জেলার ভেতরে থাকা উদ্যান, বনাঞ্চল, বিল, নদী ও কৃষিভিত্তিক প্রাকৃতিক দৃশ্য ইকো-ট্যুরিজমের বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব হলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর সিদ্ধান্তের অভাব রয়েছে। নদীতীর সংরক্ষণ, হাঁটার পথ, নৌভ্রমণ বা বিনোদনকেন্দ্র তৈরি হলে পুরো এলাকার চেহারাই বদলে যেতে পারত।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো উদ্যোক্তার ঘাটতি। ভালো মানের বিনোদনকেন্দ্র, আবাসন কিংবা পর্যটনসেবা গড়ে উঠছে না। যেগুলো আছে, সেগুলোর প্রচার সীমিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হলে অল্প সময়েই জেলার পর্যটনচিত্র বদলে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই সমন্বিত উদ্যোগ এখনো দেখা যায় না।
পর্যটনখাতে দক্ষ জনবলের অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশিক্ষিত গাইড, পর্যটনকর্মী ও ব্যবস্থাপক না থাকায় অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ টেকসই হচ্ছে না। অথচ এই খাতে কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারত।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রশাসন, স্থানীয় নেতৃত্ব, বেসরকারি উদ্যোক্তা ও পর্যটন সংগঠনগুলো একসঙ্গে কাজ করলে ময়মনসিংহকে দেশের অন্যতম পর্যটন জেলা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিক বাস্তবায়ন এবং আন্তরিক উদ্যোগ। ইতিহাস, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এই সমৃদ্ধ ভাণ্ডার যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে পর্যটনশিল্প শুধু বিকশিতই হবে না, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ময়মনসিংহের সম্ভাবনা এখনো অটুট। প্রশ্ন শুধু একটাই—এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কার্যকর উদ্যোগ কবে নেওয়া হবে।



