হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৃতীয় টার্মিনাল, ছবি: সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রায় সম্পূর্ণ তৈরি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে যেকোনো সময় যাত্রীরা ব্যাগ হাতে প্রবেশ করবে, কাউন্টার খুলবে, ফ্লাইট ছাড়বে। কিন্তু বাস্তবে ছবি অন্যরকম। নির্মাণের ৯৯ শতাংশ শেষ হলেও কবে টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হবে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনও কেউ দিতে পারছে না।

মূল জটটা প্রশাসনিক ও চুক্তিভিত্তিক। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) এবং জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি ঝুলে আছে বহুদিন ধরে। এই চুক্তি ছাড়া টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব নয়। ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকার এই বিশাল প্রকল্প এখন ঠিক সেই জায়গাতেই আটকে আছে।

একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প, কিন্তু সময়ের সঙ্গে লড়াই

চাঙ্গি বিমানবন্দরে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিঙ্গাপুরের স্থপতি রোহানি বাহারিনের নকশা করা এই টার্মিনালকে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ভবিষ্যৎ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে একটি নরম উদ্বোধনের পর আশা করা হয়েছিল ২০২৪ সালের মধ্যেই এটি আন্তর্জাতিক মানের পুরো সুবিধাসহ চালু হবে।

কিন্তু বছর পেরিয়ে ২০২৫-এর শেষেও টার্মিনাল চালুর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই। মূল সমস্যা এসেছে পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) কাঠামোর আলোচনায়। জাপান বিমানবন্দর টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো কর্পোরেশন, সোজিৎজ ও নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্পোরেশনের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম বিভিন্ন রাজস্ব খাত থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ চেয়ে এসেছে—যার মধ্যে রয়েছে ল্যান্ডিং চার্জ, নিরাপত্তা ফি, বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি এবং বাণিজ্যিক স্থান থেকে আয়।

সিএএবি তাদের প্রস্তাব মেনে নেয়নি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও চাপ এসেছে সমাধানের জন্য, কিন্তু সমঝোতার ক্ষেত্র এখনও তৈরি হয়নি।

প্রযুক্তি স্থাপিত, কিন্তু ব্যবহার অনিশ্চিত

টার্মিনালের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক বিমানবন্দরের উপযোগী যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি। কিন্তু এতদিন ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় কিছু যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত থাকলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকেই; এমন আশঙ্কা এখন প্রকল্পের আর্থিক হিসাবেও চাপ সৃষ্টি করছে।

আরেকদিকে, নির্মাণ কাজ করা কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান স্যামসাং অতিরিক্ত কাজ বাবদ প্রায় এক হাজার কোটি টাকার দাবি উত্থাপন করেছে। এই দাবি যাচাই ও অনুমোদন নিয়ে নতুন প্রশাসনিক জটিলতাও তৈরি হয়েছে।

যাত্রী ধারণক্ষমতায় বড় পরিবর্তন, কিন্তু তার আগে মানবসম্পদ প্রস্তুত নয়

টার্মিনালটি চালু হলে শাহজালাল বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা তিন গুণ বাড়বে—এখনকার প্রায় ৮০ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছানোর কথা। ইতিমধ্যেই ১২টি নতুন এয়ারলাইন ঢাকা রুটে প্রবেশের আগ্রহ দেখিয়েছে।

কিন্তু এত বড় অপারেশন পরিচালনার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত কর্মী। হিসাব বলছে, নতুন টার্মিনালের জন্য কমপক্ষে ৬০০০ জন মানবসম্পদ লাগবে, যার মধ্যে শুধু নিরাপত্তা বিভাগেই প্রয়োজন ৪০০০ কর্মী। কনসোর্টিয়াম যদি চুক্তি চূড়ান্ত করে, তাদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ পেতে আরও ৫ থেকে ৬ মাস সময় লাগবে। ফলে বাস্তবসম্মত হিসাব বলছে, সবকিছু আজই ঠিক হলেও দ্রুত উদ্বোধন অসম্ভব।

অপারেশনাল প্রস্তুতি নিয়ে সতর্ক অবস্থান

সিএএবি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, এফএসএসি, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, বোর্ডিং ব্রিজ, অটোমেশন—সব সিস্টেম আন্তর্জাতিক মানে না পৌঁছালে তারা টার্মিনাল খুলবে না। অন্য বিমানবন্দর প্রকল্পের তাড়াহুড়ো করে উদ্বোধন করে যে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে, এবার সেই ভুল পুনরাবৃত্তি এড়াতে কর্তৃপক্ষ বেশি সতর্ক।

তাহলে কবে চালু হবে?

অফিসিয়ালি কেউ কিছু বলতে চাইছে না। সিএএবির কিছু কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর লক্ষ্য অনেকটাই অবাস্তব হয়ে গেছে। সব আলোচনা যদি দ্রুত সমাধানও হয়, বাস্তবে ২০২৬ সালের প্রথম দিকই অধিক সম্ভাব্য সময়সীমা।

অর্থাৎ, টার্মিনাল দাঁড়িয়ে প্রস্তুত থাকলেও তার দরজা এখনো যাত্রীদের জন্য খুলতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত চুক্তি, আর্থিক হিসাব, প্রযুক্তিগত মান যাচাই এবং মানবসম্পদ—এই সব ধাপ পেরিয়ে তৃতীয় টার্মিনাল চালুর ঘন্টা কবে বেজে উঠবে, তা দেখার অপেক্ষায় আছে এভিয়েশন খাত।

Read Previous

১ ডিসেম্বর থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে ফিরছে প্রাণ—চলাচল শুরু জাহাজ, মিলছে রাত্রিযাপনের সুযোগ

Read Next

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: ভাঙা ভল্টে অস্ত্র উদ্ধার—নিরাপত্তা ঘাটতির চরম সংকেত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular