
সেন্টমার্টিন দ্বীপ, ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটন আবার গতি পাচ্ছে। কয়েক মাস নিষেধাজ্ঞার পর দ্বীপে রাতারাতি থাকার অনুমতি ফিরেছে, আর প্রথম দিনেই দেখা গেল ভিড়, তদারকি, নিয়মকানুন আর সতর্কতার নতুন এক মিশ্র চিত্র। পুরো পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে—সরকার এবার দ্বীপ পরিচালনায় আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর, আর পর্যটকেরাও সেই পরিবর্তন প্রথম দিন থেকেই অনুভব করেছেন।
ভোরেই জেটিতে ভিড়
সোমবার সকালেই কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া জেটিতে ভিড় জমে যায়। তিনটি যাত্রীবাহী জাহাজে মোট ১১৭৪ জন পর্যটক সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে জাহাজ ছাড়ার সময় নির্ধারিত ছিল, এবং কর্মকর্তারা জানান—দুপুরের আগেই সব জাহাজ দ্বীপে পৌঁছাবে।
নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম দিন হওয়ায় অনেকেই ভোর হওয়ার আগেই জেটিতে চলে আসেন। পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ এবং জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা现场 তদারকি করেন যাতে সরকারের ১২ দফা নির্দেশনা কঠোরভাবে মানা হয়।
টিকিট–নিয়ম ভাঙায় জরিমানা
দিনের শুরুতেই ধরা পড়ে প্রথম অনিয়ম। কেয়ারি সিনদাবাদ জাহাজটি অনলাইন নিবন্ধন ছাড়া টিকিট বিক্রি করায় প্রশাসন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে। নতুন নীতিমালার প্রতি প্রশাসনের অবস্থান যে একেবারেই শূন্য সহনশীল—এটা তার প্রথম ইঙ্গিত।
পরিবেশ রক্ষায় নতুন কৌশল
সেন্ট মার্টিনকে পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে দীর্ঘদিন আগে চিহ্নিত করা হয়েছে। এবার জেটিতে থাকা সব যাত্রীকে অ্যালুমিনিয়াম বোতল দেওয়া হয়, যাতে প্লাস্টিক ব্যবহার কমে।
সঙ্গে বেশ কিছু পুরোনো নিয়ম আবারও জোরদার করা হয়েছে—
- সৈকতে কোনো মোটরচালিত যান চলবে না
- রাতের আলো, শব্দ, বারবিকিউ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
- কেয়া বন বা সংবেদনশীল এলাকায় প্রবেশ সীমিত
- কেয়া ফল সংগ্রহ–বিক্রি নিষিদ্ধ
- প্রবাল, কচ্ছপ, রাজা কাঁকড়া, শামুক–ঝিনুকসহ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করলে ব্যবস্থা
- পলিথিন ও ছোট প্লাস্টিক প্যাকেট নিষিদ্ধ
সব প্রচেষ্টার লক্ষ্য একটাই—দ্বীপকে ধরে রাখা, নষ্ট না হতে দেওয়া।
ভ্রমণ ব্যবস্থার নতুন কাঠামো
এবার থেকে শুধু অনুমোদিত ওয়েবসাইট থেকেই টিকিট কেনা যাবে। টিকিটের সঙ্গে থাকা QR কোড স্ক্যান ছাড়া কোনো যাত্রী জাহাজে উঠতে পারবেন না। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২০০০ জন দর্শনার্থী দ্বীপে প্রবেশের অনুমতি পাবেন।
আজকের ১১৭৪ জন সেই সীমার অনেক নিচে। কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন চৌধুরী জানিয়েছেন—সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে বজায় থাকবে এবং নিয়ম ভঙ্গ হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফেব্রুয়ারি মাসে পুরো দ্বীপে পর্যটন নিষিদ্ধ থাকবে, কারণ ওই সময় সামুদ্রিক প্রাণী ও প্রকৃতি সবচেয়ে সংবেদনশীল পর্যায়ে থাকে।
সাগরপথে চলাচলে নতুন অনুমোদনব্যবস্থা
বিআইডব্লিউটিএ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো জাহাজ সেন্ট মার্টিনের দিকে যেতে পারবে না। এতে অনিয়মিত বা অনুমতিহীন জাহাজ চলাচল বন্ধ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন এত কড়াকড়ি
১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হয়। পরে ২০২৩ সালে এর চারপাশের ১৭৪৩ বর্গকিলোমিটার অঞ্চলকে সামুদ্রিক সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
গত দুই দশকে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটনের কারণে প্রবাল ভাঙা, কচ্ছপের ডিম নষ্ট হওয়া, পলিথিনে ভরা সৈকত—এসব সমস্যা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এখন তাই সরকার টেকসই পর্যটনের লক্ষ্য নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম দিনেই বোঝা গেছে—সেন্ট মার্টিনে পর্যটন এখন নিয়ম–নির্ভর, পরিবেশ–কেন্দ্রিক এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এলোমেলো ভ্রমণের যুগ শেষ, নতুন শুরুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দায়িত্ববোধের চাপ।
পর্যটকদের জন্য এটি ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা, আর দ্বীপের জন্য হতে পারে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার নতুন সুযোগ।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার



