
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশ সরকার সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। সেই পথচলায় যুক্ত হলো একটি নতুন অধ্যায়। সুন্দরবন অঞ্চলে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারকে আরও কার্যকর করতে “সুন্দরবন কনজারভেশন অ্যান্ড রেস্টোরেশন ইনিশিয়েটিভ (CRIS)” নামে নতুন প্রকল্প শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা AFD প্রায় ৩০ লক্ষ ইউরো, অর্থাৎ ৪২ কোটি টাকারও বেশি সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে AFD-এর এটি প্রথম সরাসরি বিনিয়োগ, যা দুই দেশের মধ্যে পরিবেশ খাতের সহযোগিতাকে আরও দৃঢ় করছে।
প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় গত সোমবার, ১৭ নভেম্বর। বাংলাদেশ বন বিভাগ (BFD) এবং আইইউসিএন বাংলাদেশের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে এই উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়। লক্ষ্য একটাই—অতিমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা সুন্দরবনকে বৈজ্ঞানিক, টেকসই এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পদ্ধতিতে পুনরুদ্ধার করা।
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৬০ লাখের বেশি মানুষের জীবিকা, নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের রক্ষাকবচ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা নদীভাঙনের মতো দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে এই বন পাহারাদারের ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে মানুষের অনুপ্রবেশ, অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ, বন অগ্নিকাণ্ড এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র এখন গুরুতর সংকটে।
এই প্রেক্ষাপটে CRIS প্রকল্পকে একটি সময়োপযোগী এবং কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পটি চারটি বড় কাজকে কেন্দ্র করে এগোবে—ঝুঁকি-নির্ভর সংরক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়ন, বন্যপ্রাণী জরিপ এবং বাস্তুতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করা, এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও অংশীদারদের মধ্যে জ্ঞান বিনিময় ব্যবস্থা তৈরি করা।
AFD–এর ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর সিসিলিয়া কর্টেস মনে করেন, সুন্দরবন রক্ষা করা শুধু বাংলাদেশের দায়িত্ব নয়, বৈশ্বিক দায়িত্বও। তাঁর ভাষায়, প্রকল্পটি মানুষ এবং বন্যপ্রাণীর জন্য সুন্দরবনকে একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরে রাখতে উভয় দেশের যৌথ অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
বাংলাদেশের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসেন চৌধুরী বলেন, সরকারের অগ্রাধিকারই হলো সুন্দরবনের অবক্ষয় থামানো। তাঁর মতে, এই প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ আরও বাড়াবে।
আইইউসিএন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ বিপাশা হোসেন মনে করেন, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র এতটাই ভঙ্গুর যে শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত দিয়ে এটিকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। CRIS সেই দিকটাই সামনে আনবে।
প্রকল্পের আওতায় বিশদ জলবায়ু-ঝুঁকি মূল্যায়ন, জলবিদ্যাগত গবেষণা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন স্থানে পুনরুদ্ধারমূলক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে। পাশাপাশি যুবসমাজকে পরিবেশ রক্ষায় সম্পৃক্ত করা এবং করমজলের ব্যাখ্যা কেন্দ্রকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
CRIS পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ বাংলাদেশের জাতীয় সংরক্ষণ কৌশল, ডেল্টা পরিকল্পনা ২১০০, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং কুনমিং–মন্ট্রিল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর সঙ্গে। ফলে প্রকল্পটি শুধু স্থানীয় উদ্যোগ নয়; আন্তর্জাতিক পরিবেশ প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও যুক্ত।
এক কথায়, সুন্দরবনকে ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ রাখতে—জলবায়ু, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর জন্য—এই প্রকল্প একটি নতুন দিশা দেখাবে।



