
শাখারিবাজার পুরান ঢাকা,ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : পুরান ঢাকার গলি–মোড় পেরোলে একসময় আপনি বুঝতেই পারবেন না কোন পথে হাঁটছি। তবে এমন একটি রাস্তা আছে যা শুধুই রাস্তা নয়—এ যেন ঢাকার সাংস্কৃতিক DNA-র একটি জীবন্ত পাতার মতো। সেই জায়গাটির নাম শাঁখারিবাজার। এটি এমন এক গলি যেখানে প্রথম পা রাখলেই চোখে পড়ে পুরান ঢাকার অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য, মানুষের গল্প, রঙিন শিল্প আর একটি দীর্ঘ ইতিহাসের স্পর্শ। শাঁখারিবাজার মূলত শাঁখা তৈরির জন্য বিখ্যাত হলেও এই গলি ঢাকার সামাজিক–সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য কেন্দ্রবিন্দু। এমনকি ঢাকার সবচেয়ে পুরনো ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোর অন্যতম হিসেবে এটি পর্যটকদের কাছে বছরজুড়ে দারুণ আকর্ষণীয়।
যে কেউ এখানে প্রথম এলে মনে হবে, যেন সময় থেমে গেছে। আধুনিক রাস্তাঘাটের বাইরে, পুরনো বাড়িগুলোর ভাঙা দালান, লাল ইটের দেয়াল, দরজার উপরের কাঠের নকশা, আর দোকানগুলোর গায়ে ঝুলে থাকা শাঁখার নানান সুন্দর ডিজাইন একসাথে মিলে এই বাজারকে করে তুলেছে ইতিহাসের এক চলমান জাদুঘর। আর এই জাদুঘরের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারবেন—ঢাকার সংস্কৃতি শুধু বহুতল ভবন আর শপিংমলের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এমন সব গলির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এ শহরের আসল আত্মা।
শাঁখারিবাজারের ইতিহাস: তিন শতাব্দীর পুরোনো ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
শাঁখারিবাজারের ইতিহাস অনেক পুরনো। ধারণা করা হয়, এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রায় তিন শতাব্দী আগে, যখন ভারত উপমহাদেশে হিন্দু শাঁখারি সম্প্রদায় বসতি স্থাপন করে। তাঁরা মূলত সমুদ্রের শাঁখ নিয়ে তা থেকে তৈরি করতেন চুড়া, বালা, করপাশ ও অন্যান্য অলংকার। শাঁখারিরা মূলত পেশাগতভাবে শিল্পী; তাদের হাতে গড়া শাঁখা শুধু সামান্য অলংকার নয়, বরং হিন্দু বিবাহ ও ধর্মীয় আচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই থেকেই শাঁখারিপট্টি বা শাঁখারিবাজারের নাম।
ব্রিটিশ আমল থেকেই এই এলাকাটি শিল্প ও ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। অনেক ঐতিহাসিক নথিতে দেখা যায়, শাঁখারিরা তৎকালীন ঢাকা নগরের আর্থিক ও সামাজিক জীবনে একটি মূল্যবান অবদান রেখেছিল। একসময় তারা সমুদ্র থেকে শাঁখ আমদানি করতো, যা পরে ঢাকায় এসে শিল্পকর্মে পরিণত হতো। তবে কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলেছে। আজ শাঁখারিদের সংখ্যা কমে গেলেও শাঁখারিবাজার এখনো ঢাকার ঐতিহ্যের একটি দৃঢ় প্রতীক।
স্থাপত্য ও স্থানের চরিত্র: পুরান ঢাকার সত্যিকারের রূপ
শাঁখারিবাজারের স্থাপত্য বেশ ব্যতিক্রম। সরু গলি, একটির সঙ্গে আরেকটি গায়ে লেগে থাকা পুরনো বাড়ি, ঝুলে থাকা লোহার বারান্দা, দরজায় কাঠের খোদাই, আর জানালার নকশা সব মিলিয়ে এটি যেন এক সিনেমাটিক সেট। এখানকার অনেক ভবনই একশ বছরেরও বেশি পুরনো। ভাঙাচোরা হলেও এগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। সময় কাটিয়ে দিলেও এই স্থাপত্যে এখনো মুঘল আমলের প্রভাব, ঔপনিবেশিক ধারার টাচ এবং পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলী স্পষ্ট দেখা যায়।
যারা ফটোগ্রাফি করেন, তাদের জন্য শাঁখারিবাজার এক স্বপ্নের জায়গা। রঙ, আলো, মানুষের মুখ, দোকানের সাজ—সবকিছুই এক আলাদা গল্প বলে। এই বাজারে হেঁটে গেলে মনে হবে আপনি ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন। দোকানদাররা শাঁখা কাটছেন, কেউ রং করছেন, কেউ ডিজাইন করছেন, আবার কেউ গ্রাহকের হাতে শাঁখা পরিয়ে দেখাচ্ছেন। এমন দৃশ্য আজকের আধুনিক শহরে আর কোথায়ই বা দেখা যায়?
শিল্প ও সংস্কৃতি: শাঁখার শিল্প এক সত্যিকারের লোকজ ঐতিহ্য
শাঁখারিবাজারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল শাঁখার শিল্প। এখানে তৈরি হয়:
- বিয়ের শাঁখা
- বালা
- চুড়া
- আংটি
- গলার অলংকার
- পুজোর উপকরণ
প্রতিটি শাঁখা তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। প্রথমে কাঁচা শাঁখা কেটে আকার দেওয়া হয়। তারপর ঘষা, মসৃণকরণ, ডিজাইন, রং, পালিশ—এভাবে একটি শাঁখা তৈরিতে সময় লাগে কয়েকদিন। এখানকার মানুষরা প্রজন্ম ধরে এই কাজ করে আসছেন। তারা বিশ্বাস করেন এই শিল্প শুধু পেশা নয়, বরং তাদের অস্তিত্ব।
শাঁখা হিন্দু বিবাহে শুভ লক্ষণের প্রতীক। নববধূর হাতে পরার জন্য সাদা রঙের শাঁখা, লাল সিঁদুরের ডিজাইন করা শাঁখা, কাস্টমাইজড শাঁখা—সবই পাওয়া যায় এখানে। নববধূরা পরিবারসহ এখানে আসেন শাঁখা কিনতে, আর সেই মুহূর্তগুলোতে শাঁখারিবাজার রঙিন আবেগে ভরে ওঠে।
এ ছাড়া দুর্গাপূজা বা অন্য ধর্মীয় উৎসবের সময় বাজারটি থাকে গমগমে। পূজার ডেকোরেশন, আলপনার উপকরণ, ধূপকাঠির কারুশিল্প—সবই তৈরি হয় এখানকার কারিগরদের হাতে।
পরিবেশ ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য
যদিও শাঁখারিবাজার একটি গুচ্ছ-জনবহুল এলাকা, তবে এর নিজস্ব একটা ছন্দ আছে। গলির ভেতরে সবসময় আলো–ছায়ার খেলা লেগে থাকে। পুরনো ভবনের ভাঙা ছাদের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ে দোকানের ওপর। শাঁখা কাটার শব্দ, দোকানিদের ডাকে মিশে থাকা মানুষের গল্প—সব মিলিয়ে পরিবেশটা অত্যন্ত জীবনবন্ত।
বাজারের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় পুরান ঢাকার প্রাণবন্ত সামাজিক জীবন। শিশুদের খেলা, নারীদের বাজারযাওয়া, দোকানিদের আলাপ—সবই যেন এক চলমান চিত্রকর্মের মতো।
পর্যটকদের আগ্রহ: কেন এ জায়গা এত বিশেষ?
বিদেশি পর্যটকরা শাঁখারিবাজারে আসেন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখতে। স্থানীয় পর্যটকরা আসেন শাঁখার শিল্প আর পুরান ঢাকার রঙিন পরিবেশ অনুভব করতে। এখানে পাওয়া যায়—
- ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প
- রঙিন অলংকার
- অনন্য স্থাপত্য
- জীবন্ত মানুষের গল্প
- দুর্দান্ত ফটোগ্রাফির সুযোগ
এ কারণেই শাঁখারিবাজার পুরান ঢাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্রমণস্থানের একটি।
যাতায়াত ব্যবস্থা: কীভাবে পৌঁছাবেন?
শাঁখারিবাজারে পৌঁছানো বেশ সহজ।
- রিকশা: পুরান ঢাকার সর্বোত্তম পরিবহনের মাধ্যম। চাঁনখাঁরপুল, বাংলাবাজার, সদরঘাট থেকে রিকশায় ১০–১৫ মিনিটের পথ।
- বাস: শাহবাগ, ফার্মগেট, গাবতলী, মিরপুর থেকে আসা বাসগুলো চাঁনখাঁরপুল বা নবাবপুর পর্যন্ত আসে। সেখান থেকে রিকশায় পৌঁছানো যায়।
- রাইড শেয়ার: উবার/পাঠাও বাইক সহজলভ্য এবং দ্রুত।
পুরান ঢাকার সরু গলির কারণে গাড়ি ঢোকানো কঠিন, তাই বাইক বা রিকশা সবচেয়ে উপযুক্ত।
খরচের হিসাব
শাঁখারিবাজার ভ্রমণে খরচ খুবই কম। সাধারণত—
- রিকশা ভাড়া: ৩০–১০০ টাকা
- শাঁখা বা ছোট অলংকার: ৫০–২৫০ টাকা থেকে
- বিশেষ ডিজাইনের শাঁখা: ৩০০–১০০০ টাকা
- খাওয়ার খরচ: ২০০–৪০০ টাকা
মোটামুটি ৫০০–৭০০ টাকার মধ্যে পুরো অভিজ্ঞতা উপভোগ করা যায়।
থাকার ব্যবস্থা
পুরান ঢাকায় হোটেল কম, তবে আশেপাশে পাওয়া যায়:
- শাহবাগ
- আজিমপুর
- নিউমার্কেট
- সদরঘাট
এছাড়াও দূরে হলেও ফার্মগেট বা তেজগাঁও এলাকার হোটেলগুলো আরামদায়ক এবং যাতায়াত সহজ।
খাবারদাবার: পুরান ঢাকার স্বাদ না নিলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ
শাঁখারিবাজারের আশপাশে রয়েছে ঢাকার সেরা খাবারসমূহ:
- হাজীর বিরিয়ানি
- নান্নার বিরিয়ানি
- কাবাব
- পুরান ঢাকার মিষ্টি
- ফালুদা
- বিখ্যাত লাচ্ছি
এখানকার খাবারের স্বাদ আলাদা। যারা ফুডি, তারা দারুণ উপভোগ করবেন।
পর্যটকদের জন্য পরামর্শ
- গলিপথ সরু, তাই ভিড় কম সময়ে গেলে আরামদায়ক।
- ছবি তুলতে চাইলে স্থানীয়দের অনুমতি নেওয়া ভালো।
- শাঁখা কেনার সময় দরদাম করতে ভুলবেন না।
- ভিড়ের মধ্যে নিজের জিনিসপত্রের দিকে খেয়াল রাখুন।
- স্থানীয়দের সঙ্গে বিনয়ী আচরণ করলে তারা আরো সহযোগিতা করে।
শাঁখারিবাজার পুরান ঢাকার একটি সত্যিকারের জীবন্ত ইতিহাস। এখানে এসে আপনি শুধু শাঁখা দেখবেন না, বরং দেখবেন মানুষের গল্প, শিল্প, রঙ, আলোর খেলা আর শত বছরের ঐতিহ্য। ঢাকা ঘুরতে গেলে স্টার মসজিদ, লালবাগ কেল্লা, আর্মেনীয় চার্চের মতো শাঁখারিবাজারও এক অপরিহার্য ঠিকানা। এখানে একবার এলেই শহরের আত্মাকে আরও কাছ থেকে অনুভব করা যায়।
ঢাকা ভ্রমণকে স্মরণীয় করতে চাইলে শাঁখারিবাজার আপনার তালিকার শীর্ষে রাখাই উচিত।



