
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি দক্ষ কর্মী আনার সবচেয়ে বড় কর্মসূচি এইচ–১বি ভিসা দীর্ঘদিন ধরে দেশটির প্রযুক্তি খাত ও বৈশ্বিক প্রতিভা বিনিময়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এবার এই কর্মসূচিকেই পুরোপুরি বন্ধের পথে নিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক কঠোর নিয়ম জারি করার পর শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসে সরাসরি বাতিলের প্রস্তাব গিয়েছে। এতে প্রযুক্তি খাত থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত বহু সেক্টরে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য মার্জোরি টেইলর গ্রিন এই বিলটি কংগ্রেসে উত্থাপন করেন। গ্রিন দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত, আর তাই তার এই উদ্যোগে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিলটি উত্থাপনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, এইচ–১বি ভিসা “প্রতারণা আর অপব্যবহারে ভরা”। তার মতে, বছরের পর বছর মার্কিন নাগরিকদের চাকরি খোয়ানোর একটি বড় কারণ হল বিদেশিদের এই কর্মসূচির মাধ্যমে নিয়োগ।
তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো—অ্যামাজন, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা, অ্যাপল—এবং বিভিন্ন হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকানদের বাদ দিয়ে বিদেশিদের চাকরি দিয়েছে। গ্রিনের যুক্তি, দেশটিকে প্রযুক্তি বা স্বাস্থ্যসেবায় এগোতে হলে প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত স্থানীয় কর্মীদের সুযোগ দেওয়া। তাই বিজ্ঞান, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য দক্ষতার ক্ষেত্রে মার্কিনদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে এইচ–১বি কর্মসূচি বাতিল করা জরুরি।
তবে প্রস্তাবিত বিলে পুরোপুরি দরজা বন্ধ রাখা হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য আলাদা একটি ছাড় রাখা হয়েছে, যেখানে প্রতিবছর সর্বোচ্চ দশ হাজার বিদেশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে আসার সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু তাদের জন্য শর্ত কঠিন—এদের কেউই আর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। অর্থাৎ আসবেন, কাজ করবেন, তারপর দেশে ফিরে যেতে হবে।
২০০৪ সালে চালু হওয়া এইচ–১বি ভিসা কর্মসূচি প্রতি বছর প্রায় পঁচাশি হাজার বিদেশি পেশাজীবীকে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের অনুমতি দেয়। ভারতীয়রা এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী; এরপরই রয়েছে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি দেশের আবেদনকারী। অনেকেই এই ভিসাকে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়ার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখতেন। নির্দিষ্ট সময় কাজের পর স্থায়ী বাসস্থানের সুযোগ এবং পরবর্তীতে নাগরিকত্ব পাওয়ার পথও খোলা ছিল।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরেই অভিবাসন ব্যবস্থায় কঠোরতা বাড়িয়েছে। গত কয়েক মাসে এইচ–১বি নিয়ে একের পর এক নিয়ম পরিবর্তন এসেছে। প্রথম ধাক্কাটি আসে যখন জানানো হয়, এখন থেকে নতুন করে এইচ–১বি ভিসার জন্য যে কোনো মার্কিন প্রতিষ্ঠানকে সরকারকে এক লক্ষ ডলার ফি দিতে হবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় এক কোটি বিশ লক্ষ টাকা। শুধু নতুন আবেদনকারীদেরই এই ফি দিতে হবে; যাদের ভিসা ইতিমধ্যে রয়েছে তারা দেশে ফেরার পর পুনঃপ্রবেশে কোনো বাড়তি টাকা দিতে হবে না।
এতেই শেষ নয়। প্রচলিত লটারি ব্যবস্থা বাদ দিয়ে নতুন নির্বাচন পদ্ধতি চালুর ঘোষণা আসে। আগে এলোমেলো লটারির মাধ্যমে আবেদন বাছাই হতো, এখন সেই পদ্ধতির জায়গায় আসছে দক্ষতা, কাজের প্রকৃতি এবং মার্কিন শ্রমবাজারের অগ্রাধিকারভিত্তিক বাছাই।
এরই মধ্যে নীতিতে আরেকটি মোড় আসে। ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র আসলে পুরোপুরি বিদেশি প্রতিভার বিপক্ষে নয়। কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন কর্মীরা এখনও দক্ষতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকায় বিদেশিদের সাময়িকভাবে আনা দরকার। প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, সরকারের নতুন ভাবনা হলো বিদেশি কর্মী আসবেন তিন থেকে সাত বছরের জন্য, তারা মার্কিন কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবেন, তারপর দেশে ফিরে যাবেন। এটিকে তিনি ‘জ্ঞান আদান–প্রদানের প্রচেষ্টা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
এরপরই ঘোষণা আসে নতুন নিয়মের: এখন থেকে এইচ–১বি ভিসা কেবল অস্থায়ী ভিত্তিতে দেওয়া হবে। বিদেশি কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক বছরের জন্য কাজ করবেন, স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবেন, তারপর বাধ্যতামূলকভাবে দেশে ফিরে যেতে হবে। স্থায়ী বসবাস বা দীর্ঘমেয়াদি থাকা আর কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষায়, গত দুই–তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র উৎপাদন খাতের জন্য যেভাবে বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভর হয়েছে, তা এখন জাতীয় সক্ষমতায় ঘাটতি তৈরি করেছে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, জাহাজ নির্মাণ, এমনকি অটোমেশন প্রযুক্তিতেও যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়েছে। তাই লক্ষ্য হচ্ছে বিদেশিদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় দক্ষতা বাড়ানো।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ সিলিকন ভ্যালির বহু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক প্রতিভার ওপর ভর করে দ্রুত উন্নতি করেছে। বিশেষত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা, মেডিকেল রিসার্চ—এসব ক্ষেত্রে বিদেশির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ভারত সহ বহু দেশের পেশাজীবীদের মধ্যেও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। হাজার হাজার দক্ষ কর্মী যুক্তরাষ্ট্রে কাজের স্বপ্ন দেখতেন এইচ–১বি ভিসার ওপর ভিত্তি করে। নতুন নীতি কার্যকর হলে তাদের সেই পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে। যারা ইতিমধ্যে সেখানে কাজ করছেন, তারাও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন—কারণ তাদের স্থায়ী বাসস্থানের সুযোগ ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি দক্ষ কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কর্মীদের দক্ষতা তৈরিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চাইছে। বিরোধীরা বলছেন, এতে উদ্ভাবন কমে যাবে, আর যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। আর সমর্থকরা বলছেন, দেশটি অবশেষে নিজস্ব কর্মীদের ক্ষমতায়নেই জোর দিচ্ছে।
এইচ–১বি বাতিলের বিলটি শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস পাস করবে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে ছড়ানো উত্তাপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তনের এই অধ্যায় দীর্ঘ সময় আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেবে।



