
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে সাম্প্রতিক একের পর এক কঠোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অভিবাসী ও অ-অভিবাসী উভয় ধরনের ভিসার ক্ষেত্রেই কড়াকড়ি বাড়ানোয় ব্যবসা, ভ্রমণ এবং পারিবারিক অভিবাসনের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করায় কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে—দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পরও কেন বাস্তবে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে না।
সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে। আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যেসব দেশের অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি কল্যাণভাতার ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, সেসব দেশের ক্ষেত্রে এই কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে।
এর আগে আরও একটি বড় সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াশিংটন। বাংলাদেশসহ ৩৮টি দেশের নাগরিকদের জন্য বি-১ ও বি-২ ভিসার ক্ষেত্রে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত বাধ্যতামূলক করা হয়। অর্থাৎ, পর্যটন কিংবা স্বল্পমেয়াদি ব্যবসায়িক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চাইলে আবেদনকারীকে বড় অঙ্কের অর্থ আগাম জমা দিতে হবে। এতে করে সাধারণ পর্যটক, শিক্ষার্থী পরিবার কিংবা মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ কার্যত আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিছুদিন আগেই বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দাবি করেছিলেন, তাঁর বৈঠকগুলো ফলপ্রসূ হয়েছে এবং ভিসা ইস্যুতে বড় কোনো জটিলতা তৈরি হবে না। কিন্তু সফরের এক সপ্তাহ না যেতেই অভিবাসী ভিসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত আসায় সেই আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত শুধু ভ্রমণ বা অভিবাসনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাজার। নিয়মিত ব্যবসায়িক যোগাযোগ, বায়ারদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক এবং নতুন বিনিয়োগের জন্য দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত গুরুত্বপূর্ণ। ভিসা বন্ডের মতো শর্ত সেই স্বাভাবিক যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাবেক কূটনীতিকদের কেউ কেউ এই পরিস্থিতিকে সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা ও শর্ত আরও কঠোর হচ্ছে। আবার অন্য একটি মত হলো—এই সিদ্ধান্তগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অভিবাসন নীতির অংশ, যার সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো দেশের কূটনৈতিক অবস্থান সরাসরি জড়িত নাও থাকতে পারে।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ভিসা বন্ড এবং অভিবাসী ভিসা স্থগিতের উদ্দেশ্য হলো ভিসার শর্ত লঙ্ঘন রোধ করা এবং সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল অভিবাসন কমানো। তবে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, এসব পদক্ষেপ বৈধ ভ্রমণকারী ও ব্যবসায়ীদের জন্যও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমাজের একাংশ মনে করছে, সরকারের উচিত এখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও সক্রিয় ও বাস্তবমুখী আলোচনা করা। শুধু আশ্বাস নয়, নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক ছাড় বা বিশেষ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে হবে, বিশেষ করে ব্যবসায়িক ভিসার ক্ষেত্রে। অন্যথায় এই কড়াকড়ি দীর্ঘ হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও মানুষের যোগাযোগ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মার্কিন ভিসা নীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এটি কেবল ভিসার প্রশ্ন নয়, বরং কূটনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সামনে এই সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট সবার।



