
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পর্যটন বলতে সাধারণত যে নামগুলো প্রথমে আসে, সেগুলোর মধ্যে ফু কুই দ্বীপ এতদিন তেমন আলোচনায় ছিল না। কিন্তু সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের শুরুতেই থাইল্যান্ডভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদ ও ভ্রমণ ওয়েবসাইট খাওসোদ তাদের প্রকাশিত “শান্ত ও কম পরিচিত গন্তব্য” তালিকায় ফু কুই দ্বীপকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই তালিকায় থাকা স্থানগুলোর বিশেষত্ব হলো— এগুলো এখনও গণপর্যটনের চাপে পড়েনি, পৌঁছানো তুলনামূলক কঠিন, কিন্তু অঞ্চলের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
ভিয়েতনামের লাম ডং প্রদেশের অন্তর্গত ফু কুই দ্বীপকে খাওসোদ বর্ণনা করেছে “প্রাচীন আবহ, প্রবল বাতাস আর সিনেমার মতো দৃশ্যে ভরা এক দ্বীপ” হিসেবে। তাদের মতে, যারা ভিড় এড়িয়ে সত্যিকারের আলাদা কিছু খুঁজছেন, তাদের জন্য ফু কুই হতে পারে আদর্শ গন্তব্য।
ভিড়ের ফু কুওক থেকে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা
বর্তমানে ভিয়েতনামের জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপ ফু কুওক পর্যটকদের ভিড়ে পরিপূর্ণ। সেই তুলনায় ফু কুই দ্বীপ একেবারেই আলাদা। এখানে পৌঁছাতে হলে মূল ভূখণ্ডের ফান থিয়েট শহর থেকে নৌপথে প্রায় ১২০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয়। এই যাত্রাই অনেকের কাছে দ্বীপটিকে এখনও “অস্পর্শিত” রেখেছে।
খাওসোদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফু কুই দ্বীপ অনেকটা ৩০ বছর আগের ভিয়েতনামী সৈকতগুলোর স্মৃতি ফিরিয়ে আনে— যখন সমুদ্র ছিল পরিষ্কার, উপকূল ছিল শান্ত, আর পর্যটন মানেই ছিল প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ।
আগ্নেয় দ্বীপের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য
ফু কুই মূলত একটি আগ্নেয় দ্বীপ। এর মোট আয়তন ১৮ বর্গকিলোমিটারের কিছু বেশি হলেও দ্বীপটি আশপাশের ছোট ছোট দ্বীপ ও শিলাখণ্ড মিলিয়ে বৈচিত্র্যে ভরপুর। মূল দ্বীপ ছাড়াও হোন দা কাও, হোন ডো, হোন ট্রান ও হোন হাই— এই চারটি ছোট দ্বীপ ফু কুইকে ঘিরে রেখেছে। প্রতিটি দ্বীপের নিজস্ব ভূপ্রকৃতি ও সৌন্দর্য রয়েছে।
এই দ্বীপে পাহাড়, খাড়া ক্লিফ, আধচন্দ্রাকার সৈকত, আগ্নেয় শিলা আর স্বচ্ছ ফিরোজা জল একসঙ্গে দেখা যায়। ফলে অল্প এলাকাতেই পর্যটকরা নানান ধরনের দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।
ভ্রমণের সেরা সময় ও আবহাওয়া
ফু কুই ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত। এই সময়ে সমুদ্র তুলনামূলক শান্ত থাকে এবং বাতাস থাকে সহনীয়। বিশেষ করে মার্চ থেকে মে মাসকে দ্বীপের সবচেয়ে সুন্দর সময় হিসেবে ধরা হয়। এই সময় আকাশ পরিষ্কার থাকে, সমুদ্রের রং সবচেয়ে উজ্জ্বল দেখা যায় এবং ছবি তোলার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়।
এই মৌসুমেই দেশীয় পর্যটকদের পাশাপাশি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পর্যটকরাও ফু কুইয়ের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন।
দ্বীপ ঘোরার অভিজ্ঞতা
ফু কুই দ্বীপে ঘোরার সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায় হলো মোটরবাইক। পর্যটকরা সহজেই মোটরবাইক ভাড়া করে দ্বীপের চারপাশ ঘুরে দেখতে পারেন। রাস্তার দু’পাশে পাহাড়, সমুদ্র আর খোলা আকাশ— সবকিছু মিলিয়ে যাত্রাটাই হয়ে ওঠে ভ্রমণের বড় অংশ।
এখানে নির্দিষ্ট পর্যটন রুটের কড়াকড়ি নেই। যেখানে মন চায় থেমে ছবি তোলা যায়, সমুদ্রের ধারে বসে সময় কাটানো যায়, কিংবা স্থানীয় জেলেদের দৈনন্দিন জীবন কাছ থেকে দেখা যায়।
দর্শনীয় স্থান ও প্রাকৃতিক আকর্ষণ
ফু কুই দ্বীপে দেখার মতো বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য স্থান রয়েছে। এর মধ্যে ট্রিউ ডুওং বে অন্যতম, যা শান্ত জল ও খোলা উপকূলের জন্য পরিচিত। বাই নো সৈকত পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত একটি আধচন্দ্রাকার সমুদ্রসৈকত, যেখানে ফিরোজা জল আর সাদা বালুর দৃশ্য নজর কাড়ে।
গান হ্যাং এলাকাটি দ্বীপের সবচেয়ে নাটকীয় স্থানগুলোর একটি। এখানে খাড়া পাহাড় সরাসরি সমুদ্রে নেমে গেছে, আর ঢেউ আছড়ে পড়ে প্রাকৃতিক গর্জ ও জলাধারের মতো দৃশ্য তৈরি করেছে, যেগুলো অনেকেই “প্রাকৃতিক ইনফিনিটি পুল” বলে থাকেন।
এছাড়া কাও ক্যাট পিক থেকে পুরো দ্বীপের দৃশ্য দেখা যায়। ল্যাং ডুওং মাছের পুকুর স্থানীয় সংস্কৃতি বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
সামুদ্রিক অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে পর্যটকরা হোন ট্রান ও হোন ডেন দ্বীপে ক্যানো ভ্রমণ করতে পারেন। এখানে স্নোরকেলিং ও মাছ ধরার সুযোগ রয়েছে।
খাবার ও স্থানীয় স্বাদ
ফু কুই দ্বীপের খাবারের বড় আকর্ষণ হলো সামুদ্রিক খাবার। বিশেষ করে কিং ক্র্যাব ও মুন ক্র্যাব দ্বীপের সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি খাবার। তাজা ধরা সামুদ্রিক খাবার সাধারণ কিন্তু স্বাদে সমৃদ্ধভাবে রান্না করা হয়, যা পর্যটকদের কাছে ভিন্ন অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
ধীরে ধীরে বাড়ছে জনপ্রিয়তা
চন্দ্র নববর্ষের সময় ফু কুই দ্বীপ দেশীয় পর্যটকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে এখনো এটি বড় পর্যটন কেন্দ্রের মতো ভিড়াক্রান্ত নয়। খাওসোদ-এর তালিকাভুক্তির মাধ্যমে দ্বীপটি আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে।
ফু কুইয়ের পাশাপাশি তালিকায় আরও কয়েকটি কম পরিচিত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় গন্তব্যও রয়েছে, যা প্রমাণ করে— এখন অনেক পর্যটকই ভিড়ের বদলে শান্ত, প্রকৃতিনির্ভর ও বাস্তব অভিজ্ঞতার দিকে ঝুঁকছেন।
ফু কুই দ্বীপ সেই প্রবণতারই এক জীবন্ত



