মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জেট ফুয়েলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি, চাপে এভিয়েশন খাত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে দু’দফায় জেট ফুয়েলের দাম লিটারে মোট ১০৭ টাকা বেড়ে গেছে। ফলে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য দাঁড়িয়েছে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

গত ৮ মার্চ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রথম দফায় জেট ফুয়েলের মূল্য ৯৫ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১২ টাকা ৪১ পয়সা নির্ধারণ করে। এর ঠিক ১৬ দিনের মাথায় দ্বিতীয় দফায় প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি করে নতুন মূল্য ২০২ টাকা ২৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এভাবে অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক এই মূল্যবৃদ্ধি এভিয়েশন খাতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

একই সময়ে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য জেট ফুয়েলের দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন গত ১৬ দিনে দু’দফায় মূল্য বৃদ্ধি করে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ০.৬২৫৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১.৩২১৬ ডলার নির্ধারণ করেছে। উল্লেখ্য, অভ্যন্তরীণ রুটের ক্ষেত্রে শুল্ক ও মূসকসহ এবং আন্তর্জাতিক রুটের ক্ষেত্রে শুল্ক ও মূসক ব্যতীত মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

এয়ারলাইন্সগুলোর মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশই ব্যয় হয় জেট ফুয়েলে। সেই হিসাবে গত ১৬ দিনে দেশে জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ১১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় এভিয়েশন ব্যবসা এখন চরম সংকটের মুখে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবং নিকট ভবিষ্যতে এ ধারা থামার কোনো ইঙ্গিতও নেই।

আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের জেট ফুয়েলের বর্তমান মূল্য আরও অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, কলকাতায় প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ০.৬২ ডলার, মাস্কাটে ০.৬০৩ ডলার, দুবাইয়ে ০.৫৮৭ ডলার, জেদ্দায় ০.৫৮১ ডলার এবং দোহায় ০.৫৮৪ ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ব্যাংককে এই দাম ১.০৯৮ ডলার এবং সিঙ্গাপুরে ০.৫৮৬ ডলার, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম।

পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনামূলক চিত্রও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। যেখানে ভারত ও নেপালে জেট ফুয়েলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, সেখানে পাকিস্তানে মূল্য বেড়েছে ২৪.৪৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮.৫৪ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৮০ শতাংশ, যা আঞ্চলিক মানদণ্ডের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান।

এই পরিস্থিতিতে এয়ারলাইন্সগুলোর সামনে ভাড়া বৃদ্ধি ছাড়া কার্যত অন্য কোনো পথ খোলা নেই। তবে ভাড়া বাড়ালেই যে সংকট কাটবে, তা নয়। বরং টিকিটের দাম বাড়লে যাত্রী সংখ্যা কমে যাওয়াই স্বাভাবিক, যা যাত্রী প্রবৃদ্ধি, রুট টেকসইতা এবং সামগ্রিক ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু যাত্রী পরিবহনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কার্গো খাতে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ছোট ও নতুন এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় যেমন প্রয়োজন, তেমনি এভিয়েশন খাতকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক নীতিগত সহায়তাও অপরিহার্য। পাশাপাশি এয়ারলাইন্সগুলোকেও জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, রুট পুনর্বিন্যাস এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের দাবি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি প্ল্যাটস রেট বৃদ্ধিই এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ। তবে বাস্তবতা হলো, জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য এখন পুরো এভিয়েশন শিল্পের ওপর এক বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে—যার প্রভাব পড়বে এয়ারলাইন্স, যাত্রী এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।

মোঃ কামরুল ইসলাম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ঢাকা পোস্ট

Read Previous

জেট ফুয়েলের দামে ৮০ শতাংশ লাফ: ডোমেস্টিক ফ্লাইটের ভাড়া বাড়বে কি না, সংকটে যাত্রীরা

Read Next

তিন বছরের নিষেধাজ্ঞা শেষে কেউক্রাডংয়ে ফিরেছে পর্যটকদের ঢল: ঈদের ছুটিতে পাহাড়চূড়ায় নৈশ্বর্গিক শান্তির স্বাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular