
ছবি: প্রতীকী
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আজ মঙ্গলবার এক প্রজ্ঞাপনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৯০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। নতুন দাম আজ মধ্যরাত থেকেই কার্যকর হবে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, নভোএয়ার, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও এয়ার অ্যাস্ট্রা সহ সব এয়ারলাইন্সের যাত্রীরা এখন উদ্বিগ্ন—কোম্পানিগুলো কি খরচের বোঝা নিজেরা বহন করবে, নাকি ভাড়া বাড়িয়ে যাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেবে?
বিইআরসির প্রজ্ঞাপন অনুসারে, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য জেট এ-১ ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি ১১২.৪১ টাকা থেকে বেড়ে ২০২.২৯ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৮৯.৮৮ টাকা বা ৮০ শতাংশের মতো বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই সিদ্ধান্ত আসছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে। বিইআরসি জানিয়েছে, প্ল্যাটস রেট, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার এবং স্থানীয় পরিবহন খরচ বিবেচনা করে এই সমন্বয় করা হয়েছে।
এয়ারলাইন্স অপারেটররা ইতোমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, জেট ফুয়েল এয়ারলাইন্সের মোট অপারেটিং খরচের একটি বড় অংশ। অভ্যন্তরীণ রুটে একটি ফ্লাইটে যে পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার হয়, তাতে লিটারপ্রতি ৯০ টাকা বৃদ্ধি মানে প্রতি ফ্লাইটে লাখ লাখ টাকার অতিরিক্ত খরচ। ফলে ভাড়া বৃদ্ধি ছাড়া বিকল্প কম। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, “এই খরচ বহন করা কঠিন। আমরা যাত্রীদের সুবিধা রক্ষা করতে চাই, কিন্তু বাস্তবে ভাড়া সমন্বয় করতে হতে পারে।” নভোএয়ার, ইউএস-বাংলা ও এয়ার অ্যাস্ট্রার মতো বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোও একই অবস্থানে। তারা বলছে, লাভের মার্জিন ইতোমধ্যে সংকুচিত, নতুন খরচ যোগ হলে টিকেটের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।
যাত্রীদের মধ্যে এখন থেকেই প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-কক্সবাজারসহ জনপ্রিয় অভ্যন্তরীণ রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী অনেকে আশঙ্কা করছেন যে, ভাড়া ১০-২০ শতাংশ বা তারও বেশি বাড়তে পারে। একজন নিয়মিত যাত্রী বলেন, “আগে থেকেই ফ্লাইটের ভাড়া বেশি। এখন জ্বালানির দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জন্য বিমান ভ্রমণ আরও দুরূহ হয়ে যাবে।” বিশেষ করে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও পর্যটকদের ওপর এর প্রভাব পড়বে।
তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এয়ারলাইন্সগুলো স্বল্পমেয়াদে ভাড়া না বাড়িয়ে অন্যান্য খরচ কমিয়ে বা দক্ষতা বাড়িয়ে সামাল দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্লাইট শিডিউল অপটিমাইজ করা, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার এবং লোড ফ্যাক্টর বাড়ানোর মাধ্যমে কিছুটা সুরাহা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে খরচের এই বৃদ্ধি অবশ্যই ভাড়ায় প্রতিফলিত হবে বলে তারা জানান।
বিইআরসির এই সিদ্ধান্ত আসার পর এয়ারলাইন্স অ্যাসোসিয়েশনগুলো কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের দাবি জানিয়েছে। তারা বলছে, এই হঠাৎ বৃদ্ধি “অযৌক্তিক” এবং যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে, বিইআরসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে টিকেট কেনার সময় সতর্ক থাকতে। এয়ারলাইন্সগুলো যদি ভাড়া বাড়ায়, তাহলে তা কার্যকর হওয়ার আগেই টিকেট কেটে নেওয়া যেতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সার্বিকভাবে, জেট ফুয়েলের এই বড় ধরনের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহন খাতকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যাত্রীদের সুবিধা ও এয়ারলাইন্সের টিকে থাকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনে এয়ারলাইন্সগুলো কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষায় রয়েছেন।



