
ডিম পাহাড়, ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বান্দরবানের রুমা উপজেলায় অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কেউক্রাডং তিন বছর পর আবার পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে বন্ধ থাকা এই পর্যটন কেন্দ্র ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে শর্তসাপেক্ষে খুলে দেওয়া হয়। আর এই সুযোগ ছাড়তে নারাজ পর্যটকরা। চলতি ঈদুল ফিতরের লম্বা ছুটিতে কেউক্রাডংয়ে ক্রমশই ভিড় বাড়ছে। পাহাড়ের চূড়ায় প্রকৃতির সাথে রাত্রিযাপন যেন এক অপার্থিব শান্তি এনে দিচ্ছে প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে। মেঘের সমুদ্র, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য আর ঘন জঙ্গলের মাঝে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা এখন ঈদের ছুটির অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
কেউক্রাডংয়ের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯৮৬ মিটার (৩২৩৫ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত এই শৃঙ্গটি একসময় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে জরিপে তাজিংডংকে সর্বোচ্চ ঘোষণা করা হলেও কেউক্রাডং এখনো দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হিসেবে স্বীকৃত। বান্দরবান-মায়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত এই পাহাড় ঘন বন, ঝর্ণা আর মেঘের আবরণে ঘেরা। আগে বগালেক থেকে ৩-৪ ঘণ্টার ট্রেকিং করে চূড়ায় পৌঁছাতে হতো। কিন্তু সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত নতুন সড়কের কারণে এখন জিপ, মোটরসাইকেল বা চান্দের গাড়িতে সরাসরি চূড়ায় যাওয়া সম্ভব। এটি দেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক হিসেবেও পরিচিত, যার উচ্চতা ৯৬৫ মিটারেরও বেশি। এই সুবিধা পর্যটকদের জন্য ভ্রমণকে আরও সহজ ও আকর্ষক করে তুলেছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রায় তিন বছর বন্ধ থাকায় স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়েছিলেন। লালা বমের মতো উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন পর্যটকশূন্যতায় তাদের জীবিকা ব্যাহত হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের অক্টোবরে খুলে দেওয়ার পর থেকেই পর্যটক সমাগম শুরু হয়। প্রথম দিনেই ৮০০-এর বেশি পর্যটক চূড়ায় পৌঁছান। এখন ঈদের ছুটিতে সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে। বান্দরবান জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুসারে, রুমা ও থানচি এলাকায় পর্যটকদের প্রধান গন্তব্য এখন কেউক্রাডং ও বগালেক। পরিবারসহ তরুণ-তরুণীরা মোটরসাইকেলে বা গাড়িতে করে ছুটে আসছেন। ট্যুর অপারেটররা জানিয়েছেন, ঈদের আগের সপ্তাহ থেকেই বুকিংয়ের হিড়িক পড়েছে। অনেকে ২২-২৩ মার্চ থেকে শুরু করে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ট্যুর প্ল্যান করছেন।
পাহাড়চূড়ায় রাত্রিযাপনের আকর্ষণই আলাদা। চূড়ায় ছোট ছোট কটেজ ও ক্যাম্পিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। রাতে মেঘের সমুদ্রের মাঝে তারা দেখা, ঠান্ডা হাওয়া আর নীরবতা যেন শহরের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এক পর্যটক বলেন, “ঈদের ছুটিতে এমন জায়গায় আসা মানে সত্যিকারের বিশ্রাম। দিনের আলোয় সবুজ পাহাড় আর রাতে অন্ধকারে প্রকৃতির গান শোনা—এ অভিজ্ঞতা অবিস্মরণীয়।” আরেকজন জানান, “তিন বছর অপেক্ষা করার পর এখন গাড়িতে চড়ে চূড়ায় উঠতে পারছি। রাতে ক্যাম্পফায়ার করে গান গাওয়া, সকালে সূর্যোদয় দেখা—এটাই তো প্রকৃতির সাথে মিলন।” স্থানীয় গাইডরা বলছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেকপয়েন্টে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। লাইসেন্সপ্রাপ্ত গাইড ছাড়া ভ্রমণ নিষিদ্ধ। জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি সহ বিভিন্ন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে পর্যটকদের ছয়টি শর্ত মানতে হচ্ছে—যেমন নির্দিষ্ট এলাকায় থাকা, পরিবেশ রক্ষা করা ইত্যাদি।
কেউক্রাডংয়ের পর্যটন শিল্প এখন নতুন করে জেগে উঠছে। স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব স্পষ্ট। হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, গাইড সার্ভিস ও স্থানীয় হস্তশিল্পের বিক্রি বেড়েছে। রুমা উপজেলার বাসিন্দারা বলছেন, পর্যটকদের আগমনে তাদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরেছে। তবে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও উঠে আসছে। কিছু প্রকৃতিপ্রেমী চিন্তিত যে নতুন সড়ক ও কটেজ নির্মাণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই পর্যটকদের প্রতি আহ্বান—প্লাস্টিক বর্জ্য না ফেলা, বন্যপ্রাণী বিরক্ত না করা। বান্দরবান ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, “পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায় আমরা সতর্ক। সবাই যেন নিয়ম মেনে ভ্রমণ করেন।”
ঈদের ছুটিতে কেউক্রাডংয়ে যাওয়ার সেরা সময় এখন। বগালেক থেকে শুরু করে চূড়া পর্যন্ত পুরো রুটটি এখন সহজলভ্য। সকালে মেঘের মাঝে সূর্যোদয় দেখা, দিনে ট্রেকিং বা ফটোগ্রাফি, রাতে ক্যাম্পিং—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব অভিযান। তবে ভ্রমণপিপাসুরা সতর্ক থাকুন। আবহাওয়া পরিবর্তনশীল, তাই গরম কাপড়, টর্চ, প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী সঙ্গে রাখুন। স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে পারেন—আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী রান্না, তাজা ফলমূল। অনেক ট্যুর অপারেটর ঈদ স্পেশাল প্যাকেজ দিচ্ছেন, যাতে পরিবহন, থাকা ও খাবার সব অন্তর্ভুক্ত।
কেউক্রাডং শুধু একটি পর্বত নয়, এটি প্রকৃতির সাথে মানুষের পুনর্মিলনের প্রতীক। তিন বছরের বন্ধের পর এখন যখন ঈদের আনন্দে পর্যটকরা ছুটে আসছেন, তখন স্থানীয়রা স্বপ্ন দেখছেন আরও বড় পর্যটন উন্নয়নের। ভবিষ্যতে আরও সুবিধা যোগ হলে এই স্থান দেশের অন্যতম শীর্ষ পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা—প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, রক্ষা করুন। তাহলেই এই নৈশ্বর্গিক শান্তি চিরকাল অটুট থাকবে।
ঈদের ছুটি শেষ হলেও কেউক্রাডংয়ের টান থেকে মুক্তি নেই। যারা এখনো যাননি, তাদের জন্য এটি একটি অসাধারণ সুযোগ। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে যখন চারপাশে মেঘ ভেসে বেড়ায় আর রাতের আকাশে তারার মেলা বসে, তখন মনে হয়—প্রকৃতি সত্যিই সবচেয়ে বড় শান্তির উৎস। এই ঈদে কেউক্রাডংয়ের সেই শান্তি উপভোগ করুন, প্রকৃতির সাথে একাত্ম হোন।



