
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের (বিমান) পাইলটরা দীর্ঘদিন ধরে আইনি ফ্লাইট ডিউটি সীমা অতিক্রম করে বিমান চালাতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে পাইলটদের মধ্যে চরম ক্লান্তি ছড়িয়ে পড়ছে, যা যাত্রী নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভ্যন্তরীণ সূত্র ও নিরাপত্তা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যায়, গত ছয় মাসে ৫০০-এরও বেশি নিরাপত্তা সংক্রান্ত রিপোর্ট জমা পড়েছে, কিন্তু এর কোনোটিরই কার্যকর সমাধান হয়নি। এ অবস্থা দেশের বিমান চলাচল খাতের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি)-এর নিয়ম অনুসারে, পাইলটদের টানা ১২ মাসে সর্বোচ্চ ১,০০০ ঘণ্টা ফ্লাইট করার অনুমতি রয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইসিএও) অ্যানেক্স ৬-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিমানের পাইলটদের বছরে ১,২০০ ঘণ্টা এবং কিছু ক্ষেত্রে ১,৪০০ ঘণ্টারও বেশি ফ্লাইট করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত চাপের ফলে পাইলটরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন।
পাইলটদের অভিযোগ, যারা এই সীমা লঙ্ঘনের বিরোধিতা করেছেন, তাদের পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়েছে, চাকরির নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে এবং মানসিক চাপ দেওয়া হয়েছে। একাধিক ক্রু সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “ব্যবস্থাপনা থেকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে নিয়ন্ত্রক সীমা যাই হোক না কেন, ফ্লাইট চালাতে হবে।” এতে নিরাপত্তা সংস্কৃতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গত ছয় মাসে জমা পড়া ৫০০-এর বেশি নিরাপত্তা প্রতিবেদনে ফ্লাইট ডিউটি লঙ্ঘন ও ক্লান্তির ঝুঁকি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো বিমানের সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এসএমএস)-এর মাধ্যমে দায়ের করা হলেও কোনো সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পাইলটরা সরাসরি সিএএবি-এর ফ্লাইট সেফটি ডিভিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, কিন্তু তদন্ত শুরু হয়নি। একজন প্রাক্তন নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা বলেন, “এতগুলো সতর্কতা সংকেত উপেক্ষা করা মানে পদ্ধতিগত ব্যর্থতা। এটি বিমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।”
ক্লান্তির মানবিক মূল্যও ভয়াবহ। অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুসারে, ছয়জন পাইলট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন, দুজন ফ্লাইট চলাকালীন অজ্ঞান হয়ে গেছেন, কয়েকজনের মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং একজন পাইলট ফ্লাইটের মাঝামাঝি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, অনিয়মিত ঘুম এবং উচ্চ চাপ হৃদরোগ, মানসিক অবসাদ এবং শারীরিক জটিলতার প্রধান কারণ। ক্লান্ত পাইলটদের প্রতিক্রিয়া সময় কমে যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হয় এবং পরিস্থিতি সচেতনতা হ্রাস পায়—যা বিশ্বব্যাপী অনেক বিমান দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
বিমানের এই সমস্যার পেছনে পাইলট ঘাটতি, ব্যস্ত রুটের চাহিদা এবং সীমিত রিজার্ভ ক্রু পুলকে দায়ী করা হচ্ছে। শেষ মুহূর্তের ফ্লাইট পরিবর্তন এবং অপারেশনাল চাপ সিস্টেমকে আরও অস্থির করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, সিএএবি পূর্বে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (ইএএসএ)-এর মানদণ্ড থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফ্লাইট ডিউটি সীমা কিছুটা বাড়িয়েছে (মাসে ১২০ ঘণ্টা, বছরে ১,২০০ ঘণ্টা), কিন্তু ক্লান্তি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সিস্টেম (এফআরএমএস) চালু করেনি। এতে দুর্বল তদারকি এবং লঙ্ঘনের সুযোগ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই লঙ্ঘন গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আইসিএও-এর ইউনিভার্সাল সেফটি ওভারসাইট অডিট প্রোগ্রাম (ইউএসওএপি)-এর অধীনে বাংলাদেশের বিমান চলাচল তদারকি ব্যবস্থা যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়তে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে অপারেশনাল বিধিনিষেধ, বাধ্যতামূলক সংশোধন পরিকল্পনা বা আন্তর্জাতিক রেটিং হ্রাস হতে পারে। বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ এবং বিমান চলাচলের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এই ধরনের সমস্যা বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিমান চলাচল নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জরুরি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তারা ফ্লাইট ডিউটি সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ, উপেক্ষিত নিরাপত্তা প্রতিবেদনের স্বাধীন তদন্ত এবং এফআরএমএস বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছেন। একজন প্রাক্তন সিএএবি চেয়ারম্যান বলেন, “পরিচালনাগত সুবিধার জন্য নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা যাবে না। পাইলটদের নিরাপদ সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য করলে পুরো বিমান ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ে।”
বিমান কর্তৃপক্ষ এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সতর্কতা উপেক্ষা করলে দেশের বিমান চলাচল খাতের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়বে। যাত্রী নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।



