
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ি ইউনিয়নের নিভৃত গিলাবাড়ি গ্রামে অবস্থিত মোগল আমলের প্রাচীন মসজিদটি আজ শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের এক অসাধারণ পর্যটন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। কয়েক শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যারা ইতিহাস, স্থাপত্যশিল্প এবং শান্তিপূর্ণ গ্রামীণ পরিবেশের স্বাদ নিতে চান, তাদের জন্য গিলাবাড়ি মসজিদ এক অবিস্মরণীয় গন্তব্য। এখানে এসে মুসল্লিদের আজানের ধ্বনি, প্রাচীন গম্বুজের ছায়া এবং চারপাশের সবুজ ধানক্ষেতের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি যেকোনো পর্যটকের মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলবে।
মসজিদটির অবস্থান লালমনিরহাট শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে, আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ি ইউনিয়নের গিলাবাড়ি গ্রামে। পাকা রাস্তা দিয়ে গাড়ি বা মোটরসাইকেলে সহজেই পৌঁছানো যায়। পথে চোখে পড়বে উত্তরবঙ্গের সবুজ প্রকৃতি, ছোট ছোট গ্রাম এবং কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। পর্যটকদের জন্য এই যাত্রা নিজেই এক অ্যাডভেঞ্চার। মসজিদে পৌঁছানোর পর প্রথমেই চোখে পড়বে তিনটি বড় গম্বুজ এবং মোট ১২টি মিনারসহ মূল ফটকের তিনটি অতিরিক্ত মিনার। মূল অবকাঠামোর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪২ ফুট এবং প্রস্থ ১৭ ফুট। চৌহদ্দিসহ প্রায় সাত শতক জমির ওপর বিস্তৃত এই স্থাপনা মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলীর অনন্য উদাহরণ। নির্মাণে ব্যবহৃত চ্যাপটা ইট, চুন এবং ইটের সুরকির মিশ্রণ আজও অটুট রয়েছে, যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এই উপকরণগুলো দেখে বোঝা যায়, কয়েক শতাব্দী আগের কারিগরদের দক্ষতা কতটা অসাধারণ ছিল।
পর্যটনের দৃষ্টিকোণ থেকে গিলাবাড়ি মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর সংরক্ষিত অবস্থা এবং এখনো সক্রিয় ধর্মীয় ব্যবহার। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয় এখানে। আজানের ধ্বনি যখন চারপাশের নীরবতা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পর্যটকরা এক অনন্য আধ্যাত্মিক অনুভূতি পান। স্থানীয়দের মতে, কয়েক শতাব্দী আগেও যেমন ধর্মীয় কার্যক্রম চলত, আজও প্রায় একইভাবে চলছে। এটি শুধু একটি পুরনো ভবন নয়, বরং জীবন্ত ইতিহাস। মসজিদের সামনে অবস্থিত প্রাচীন ইঁদারা (কুয়া) আরেকটি আকর্ষণ। অতীতে এখান থেকেই পানি সংগ্রহ করা হতো। এখন আর ব্যবহার হয় না, কিন্তু এর ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। ইঁদারার পাশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এটি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ এবং কোনো ক্ষতি করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০২২ সালের ১ আগস্ট জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকারিভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা পর্যটন উন্নয়নের জন্য এক বড় পদক্ষেপ।
গিলাবাড়ি মসজিদের পর্যটন সম্ভাবনা অপরিমেয়। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে উত্তরাঞ্চল এখনো অনেকটা অবহেলিত। কিন্তু এই মসজিদকে কেন্দ্র করে লালমনিরহাটকে নতুন করে পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরা সম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা বিভাগের সাবেক ছাত্র এবং গিলাবাড়ি গ্রামের সন্তান আবদুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, “নির্মাণশৈলী, উপকরণ এবং অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এই মসজিদটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আমলে শুধু বাইরের দেয়াল প্লাস্টার ও সাদা রং করা হয়েছে। মূল আকৃতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে প্রাচীন নান্দনিকতা এখনো অটুট।” তিনি নিজে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে আবেদন করে সংরক্ষণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছেন। বিভিন্ন সময়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা—নাহিদ সুলতানা, মো. হাবিবুর রহমান এবং মো. সাইফুজ্জামান—পরিদর্শনে এসেছেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় মসজিদটি এখন সুরক্ষিত।
পর্যটকদের জন্য এখানে কয়েকটি আকর্ষণীয় সুযোগ রয়েছে। সকালে এসে গম্বুজের ওপর সূর্যের আলো পড়ার দৃশ্য দেখা যায়। বিকেলে চত্বরে বসে চা-নাশতা খেয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে গল্প করা যায়। গ্রামের মানুষ অত্যন্ত আতিথেয়। তারা পর্যটকদের মসজিদের ইতিহাস শোনাতে ভালোবাসেন। তবে পর্যটন উন্নয়নের জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ দরকার। স্থানীয় প্রশাসন এবং পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উচিত রাস্তাঘাট উন্নয়ন, টয়লেট, পার্কিং এবং তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা। একটি ছোট জাদুঘর বা ইনফরমেশন বোর্ড তৈরি করলে পর্যটকরা আরও সহজে তথ্য পাবেন। এছাড়া আশপাশের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান—যেমন লালমনিরহাটের অন্যান্য মসজিদ বা জমিদারবাড়ি—এর সঙ্গে প্যাকেজ ট্যুর চালু করা যেতে পারে। এতে করে লালমনিরহাটের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থান বাড়বে।
বর্তমানে গিলাবাড়ি মসজিদ পর্যটকদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। প্রবেশ ফি নেই, তবে সংরক্ষণের স্বার্থে শান্তিপূর্ণভাবে ঘুরে দেখার অনুরোধ রাখা হয়েছে। যারা ফটোগ্রাফি পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি স্বর্গ। গম্বুজ, মিনার এবং ইঁদারার ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করলে অন্যদের আকৃষ্ট করবে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত মসজিদের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় এটি মোগল স্থাপত্যের এক জীবন্ত নিদর্শন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটেও এর বিস্তারিত তথ্য রয়েছে, যা গবেষক ও পর্যটকদের সাহায্য করে।
উপসংহারে বলা যায়, গিলাবাড়ি মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের এক নতুন সম্ভাবনা। যদি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এটিকে আরও প্রচার করা হয়, তাহলে লালমনিরহাট হয়ে উঠবে উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। ইতিহাসপ্রেমী, স্থাপত্যশিল্পী, ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং প্রকৃতিপ্রেমী সবাই এখানে এসে অসাধারণ অভিজ্ঞতা নিয়ে যাবেন। তাই আপনিও একবার ঘুরে আসুন লালমনিরহাটের এই অজানা রত্ন গিলাবাড়ি মসজিদ থেকে। এখানে এসে শুধু ছবি তুলবেন না, ইতিহাসের সঙ্গে কথা বলবেন, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাবেন এবং এক টুকরো শান্তি নিয়ে ফিরবেন। বাংলাদেশের এমন অসংখ্য লুকানো ঐতিহ্যই আমাদের পর্যটনের ভবিষ্যৎ। গিলাবাড়ি মসজিদ তার উজ্জ্বল উদাহরণ।



