১৮/০৪/২০২৬
৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বড়দিনের ছুটি ও পরীক্ষা-পরবর্তী অবকাশে সাজেকে পর্যটকের ঢল, সংকটে আবাসন ও পরিবহন

সাজেক

ছবি : সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বড়দিনের ছুটি, সাপ্তাহিক বন্ধ আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা শেষে টানা অবকাশ—সব মিলিয়ে বছরের শেষ প্রান্তে ভ্রমণপিপাসু মানুষের গন্তব্য হয়ে উঠেছে পাহাড়ি জনপদগুলো। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে। ছুটির সুযোগে পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনদের নিয়ে সাজেকে ছুটে গেছেন হাজারো মানুষ। ফলে কয়েক দিনের ব্যবধানে পর্যটনকেন্দ্রটি হয়ে উঠেছে অতিরিক্ত ভিড়ে ঠাসা।

পর্যটকের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সাজেকের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে তীব্র আবাসন সংকট দেখা দিয়েছে। আগে থেকে কক্ষ বুকিং না করে আসা অনেক পর্যটককে পড়তে হয়েছে চরম ভোগান্তিতে। কেউ রাত কাটিয়েছেন রিসোর্টের বারান্দা বা অফিসকক্ষে, কেউ আবার স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এমনও দেখা গেছে, থাকার জায়গা না পেয়ে অনেক পর্যটক দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন খাগড়াছড়ি শহরে।

সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির তথ্যমতে, সাজেক এলাকায় বর্তমানে প্রায় এক শ’ রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে, যেখানে সর্বমোট চার হাজারের মতো পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে অবস্থান করতে আসেন সাড়ে চার হাজারেরও বেশি পর্যটক। অতিরিক্ত এই চাপ সামাল দিতে গিয়ে রিসোর্ট মালিকদের বিকল্প ব্যবস্থায় যেতে হয়েছে। অনেককে থাকতে দেওয়া হয়েছে ক্লাবঘর, স্টোররুম, এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কক্ষেও।

রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে এত বেশি পর্যটক আগে কখনো দেখা যায়নি। সাম্পারি রিসোর্টের ব্যবস্থাপক যুগেশ্বর ত্রিপুরা জানান, তাঁদের সব কটেজের কক্ষ কয়েক দিন আগেই বুকিং হয়ে গেছে এবং আগামী শনিবার পর্যন্ত আর কোনো কক্ষ খালি নেই। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান খাস্রাং রিসোর্টের ব্যবস্থাপক সুব্রত চাকমা। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন পর্যটন খাতে যে ক্ষতি হয়েছিল, এবারের ভিড়ে তা কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রুইলুই পর্যটনকেন্দ্রের রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ বলেন, শীতের রাতে যেন কোনো পর্যটক খোলা আকাশের নিচে থাকতে না হয়, সে জন্য রিসোর্ট মালিকরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেছেন। শতাধিক পর্যটককে বিকল্প জায়গায় থাকতে দেওয়া হয়েছে। তবে আজ ও আগামীকালও সব কক্ষ সম্পূর্ণ বুকিং রয়েছে।

সাজেক ভৌগোলিকভাবে রাঙামাটি জেলায় হলেও পর্যটকদের বড় অংশ যাতায়াত করেন খাগড়াছড়ি হয়ে। ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে প্রথমে খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে সেখান থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে সাজেকে যেতে হয়। এই পথে চান্দের গাড়ি, জিপ, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেলই ভরসা। কিন্তু পর্যটকের চাপ বাড়ায় পরিবহন ব্যবস্থাতেও দেখা দিয়েছে সংকট।

খাগড়াছড়ি-সাজেক গাড়ি কাউন্টার সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সমিতির চার শতাধিক গাড়ি আগেই শুক্র ও শনিবারের জন্য বুকিং হয়ে গেছে। ফলে অনেক পর্যটক গাড়ি না পেয়ে সাজেকে যেতে পারছেন না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বাইরের মাইক্রোবাস বা মোটরসাইকেল ভাড়া করে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করছেন।

ভ্রমণে এসে বিড়ম্বনায় পড়া পর্যটকদের অভিজ্ঞতাও কম নয়। বরিশাল থেকে পরিবার নিয়ে আসা আবির রহমান জানান, সাজেকে পৌঁছে কোনো হোটেল না পেয়ে তাঁকে ফিরে যেতে হয়েছে খাগড়াছড়ি শহরে। সেখানেও ভালো মানের হোটেল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত স্বজনের বাসায় থাকতে হয়েছে। আবার ঢাকা থেকে আসা তিন বন্ধু জানান, গাড়ি না পাওয়ায় সাজেক যাত্রাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাঁদের কথায়, সুযোগ পেলে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতেও তাঁরা প্রস্তুত।

এদিকে পর্যটকের ভিড় বাড়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি ট্যুরিস্ট পুলিশের জোন ইনচার্জ জাহিদুল কবির জানান, সাজেকসহ সব পর্যটনকেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা টহল চলছে। ছুটির সময় ভিড় বেড়ে যাওয়ায় পুলিশি নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে বছরের শেষের ছুটিতে সাজেক ভ্যালি আবারও প্রমাণ করেছে, এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। তবে একই সঙ্গে আবাসন ও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে পরিকল্পিত অবকাঠামো ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এমন চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

ঘন কুয়াশায় ব্যাহত ঢাকার আকাশপথ: পাঁচ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কলকাতায় অবতরণ

Read Next

ভ্যাটিকান সিটি: ইতিহাস, বিশ্বাস ও শিল্পকলার অনন্য রাষ্ট্রে এক দিনের ভ্রমণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular