
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়ি ঢেউয়ে এখন উৎসবের বর্ণিল হাওয়া বইছে। বছর ঘুরে ফিরে এসেছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রাণের উৎসব বৈসাবি। চাকমাদের বিজু, ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাই এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের বিভিন্ন নামে পরিচিত এই উৎসব শুধু নতুন বছর বরণই নয়, বরং সম্প্রীতি, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মিলনের এক অনন্য মেলবন্ধন। এবারের বৈসাবি উপলক্ষে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি পল্লীগুলোতে চলছে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার উৎসব, যা আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের এক অনন্য উদ্যোগ হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টায় খাগড়াছড়ি সদরের পানখাইয়া পাড়া বটতলায় মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘দঃ’ (ধ) ও আলারী খেলার উদ্বোধন হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান। ‘সম্প্রীতির বন্ধন, ঐতিহ্যের গান, সাংগ্রাই হোক মিলনের প্রাণ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মারমা উন্নয়ন সংসদ ও মারমা যুব কল্যাণ সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য-গীত পরিবেশনের মাধ্যমে নতুন বছর বরণের সূচনা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, “পাহাড়ের এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের মধ্য দিয়ে সকল সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ফুটে উঠেছে। মারমা সমাজের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এই প্রয়াস প্রশংসার দাবিদার। প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা যাতে টিকে থাকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।” পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খানও উৎসবের আনন্দে অংশ নিয়ে বিভিন্ন বয়সের মানুষের উচ্ছ্বাস দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
বৈসাবি উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো সাংগ্রাইকে ঘিরে আয়োজিত বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা। ‘দঃ’ খেলা, গিলা খেলা, আলারী, পানি খেলাসহ নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন চলছে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে। এসব খেলায় শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যুবক-যুবতী এবং প্রবীণরাও অংশ নিচ্ছেন উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে। মারমা উন্নয়ন সংসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মংপ্রু চৌধুরী জানান, “আধুনিকতার প্রভাবে অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছিল। সেগুলো ফিরিয়ে আনতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানুষ সচেতন হলে কোনো সংস্কৃতিই হারিয়ে যাবে না।”
‘দঃ’ খেলা মারমা সম্প্রদায়ের একটি প্রাচীন খেলা, যেখানে খেলোয়াড়রা দক্ষতা ও শারীরিক শক্তির পরিচয় দেন। আলারী খেলায় তরুণ-তরুণীরা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন, যা দেখে মনে হয় যেন পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরে এসেছে। এছাড়া গিলা খেলা, পানি খেলা (জলকেলি) ইত্যাদি খেলাগুলো উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। প্রায় ১৫ দিন ধরে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে এসব খেলা চলবে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। বিভিন্ন মারমা পাড়ায় স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে খেলায় অংশ নিচ্ছেন, যা সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও আনন্দকে আরও গভীর করে তুলছে।
বৈসাবি উৎসব পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি শুধু বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসব নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের এক বড় মাধ্যম। মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই সাধারণত এপ্রিলের ১৩ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত (বর্মী বর্ষপঞ্জি অনুসারে পুরোনো বছরের শেষ দুই দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন) পালিত হয়। তবে এবারের আয়োজনে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যাতে নতুন প্রজন্ম ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
পাহাড়ি পল্লীগুলোতে এখন সাজ সাজ রব। ঘরে ঘরে চলছে ঐতিহ্যবাহী পাঁচন রান্না, অতিথি আপ্যায়ন এবং নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিশু-কিশোররা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে খেলায় অংশ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। অনেকে বলছেন, এই খেলাগুলো শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং শারীরিক ফিটনেস, দলীয় সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশেরও একটি অনন্য প্ল্যাটফর্ম। আধুনিক খেলাধুলা ও প্রযুক্তির প্রভাবে যেসব ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছিল, সেগুলোকে টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় যুব সংগঠনগুলোর এই উদ্যোগকে সকলে স্বাগত জানিয়েছেন।
বৈসাবি উৎসবের এই আয়োজন শুধু মারমা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী—চাকমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা সহ অন্যান্যরাও নিজ নিজ ঐতিহ্য অনুসারে উৎসব পালন করছেন। সামগ্রিকভাবে এটি পাহাড়ের সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এই উৎসব আরও সুসংগঠিতভাবে চলছে, যা পাহাড়ি অঞ্চলের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরছে।
উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সপ্তাহজুড়ে। সাংগ্রাইয়ের রঙে, খেলাধুলার উচ্ছ্বাসে এবং নৃত্য-গীতের সুরে খাগড়াছড়ি জুড়ে এখন বইছে আনন্দের ধারা। এই উৎসব শুধু বিনোদন নয়, বরং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নতুন প্রজন্ম যদি এই ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো সংস্কৃতিই হারিয়ে যাবে না—এমনটাই আশা করছেন আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা।
পাহাড়ের এই প্রাণের উৎসব বৈসাবি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি জীবন্ত ঐতিহ্যের প্রতীক। খেলাধুলা, নাচ-গান ও মিলনমেলার মাধ্যমে এই উৎসব প্রতি বছরই পাহাড়ের মানুষকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করে। আসুন, আমরা সকলে মিলে এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করি এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরি, যাতে পাহাড়ের বর্ণিল সংস্কৃতি চিরকাল জীবন্ত থাকে।



